‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’— এই পরিচিত প্রবাদটি এখন বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকাল যেন তার চিরচেনা রূপ হারাচ্ছে, আর গ্রীষ্মকালের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। শীতের সময়ে যেখানে কাঁপুনি ধরানো ঠান্ডা থাকার কথা, সেখানে এখন হালকা গরম অনুভূত হয়। শুধু তাই নয়, গ্রীষ্মকাল আসার আগেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন এবং অর্থনীতির ওপর।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু বর্তমানে নয়, ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, “গতবারের মতো এবছরও তাপমাত্রা খানিকটা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাপমাত্রা ঠিক কোন সময় বেড়ে যাবে, এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা যাচ্ছে, এই বছরের গ্রীষ্মকাল বেশ পাকাপোক্তই হবে।” তিনি আরও বলেন, “পরিবেশের উষ্ণতা সারা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। সেজন্য গত বছরের মতোই এবার অস্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকাটাই স্বাভাবিক।” তাপপ্রবাহের ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের ঐতিহ্যবাহী ঋতুচক্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। একসময়ে পৌষ ও মাঘ মাস জুড়ে থাকতো হাড় কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে আসতো ৫-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু গত ৫-১০ বছরে সেই চিত্র বদলে গেছে। শীতের তীব্রতা কমেছে, কমেছে শীতকালের স্থায়িত্বও।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের ষড়ঋতুর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের আধিপত্যে শীতকাল যেমন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে, তেমনি শরৎ, হেমন্ত ও বসন্তকালের উপস্থিতিও এখন আর তেমনভাবে টের পাওয়া যায় না।
২০২৪ সালের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের অধিকাংশ সময়ই দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। প্রায় আট মাস জুড়েই দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। অন্যদিকে, রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমেছিল মাত্র তিনটি মাসে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০২৪ সালকে পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় এই বছরটিতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক এলাকাজুড়ে চরম তাপমাত্রা অনুভব করেছে মানুষ।
বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ২০২৫ সালেও দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম পড়তে পারে। এরই মধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ— এই বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এখনই যদি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বলেন, “বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্বন নিঃসরণ সামগ্রিকভাবে একটি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে যদি আমরা এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিই।”
শুধু গ্রামীণ জীবন নয়, নগরজীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। গত সাত বছরে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে গড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে, বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে জলবায়ু-বান্ধব নীতি গ্রহণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যাপসের চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “এ বছর শীত তুলনামূলকভাবে উষ্ণ হচ্ছে। অনেক জায়গায় শীতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঠান্ডা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো আবহাওয়া প্রভাবের কারণে ২০২৪-২৫ সালের শীত বিশ্বজুড়ে কিছুটা উষ্ণ হয়েছে। এটি বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরূপ একটি প্রভাব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, গত কয়েক বছর ধরে শুধু ৩টি ঋতু দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের পরিবেশ থেকে শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত পর্যায়ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।”