মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বেহাল দশায় চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি ৬০ বছরেও

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের জাতিতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭৪ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া এই জাদুঘরটি এখন অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শিকার। প্রায় ৬০ বছর ধরে চলা এই জাদুঘরটিতে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি, যা দর্শনার্থী ও বিশেষজ্ঞদের হতাশ করেছে।

সমস্যার গভীরে

জাদুঘরের ভবনটি জরাজীর্ণ। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। গ্যালারিগুলো ধুলোবালিতে অপরিচ্ছন্ন, যেন বহুদিন ধরে পরিষ্কার করা হয়নি। অনেক আলোকচিত্র ছিঁড়ে গেছে, আবার অনেকগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। জাদুঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও লাইট-ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। আসবাবপত্রগুলোও পুরনো এবং ব্যবহারের অনুপযোগী।

এখানে বাংলাদেশের ২৩টি জাতিগোষ্ঠীসহ পাকিস্তান, ভারত, কিরগিজস্তান, অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি জাতিগোষ্ঠী এবং জার্মানির বার্লিন প্রাচীরের টুকরোর নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু জাদুঘরে সংগৃহীত প্রায় ৩২০০টি নিদর্শনের মধ্যে অধিকাংশই, জায়গার অভাবে প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি। প্রায় তিন হাজার নিদর্শন গ্রন্থাগারের পাশের স্টোরে রাখা হয়েছে, যেখানে সেগুলো অযত্নে নষ্ট হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারি গেজেটে তালিকাভুক্ত প্রায় অর্ধেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই এই জাদুঘরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টিসহ দেশের ২৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হলেও, অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতিগোষ্ঠী বাদ পড়েছে। জাদুঘরে একটি গ্রন্থাগার থাকলেও, সেটির অবস্থাও তথৈবচ।

আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা এবং ব্যর্থতা

২০১৪ সালে জাদুঘরটির প্রদর্শনী উন্নয়ন, সংগ্রহ বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য ৩ কোটি ২১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় একটি টিকিট কাউন্টার, একটি স্যুভেনিয়ার শপ (দোকান), ছাদ সংস্কার, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন এবং একটি বড় জেনারেটর কেনা হয়। এছাড়াও, একটি দোতলা অফিস ভবন ও ডরমিটরি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু মূল ভবনের বড় ধরনের কোনো সংস্কার করা হয়নি, যা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

জাদুঘরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুজ্জামান জাদুঘরের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং লোকবলের অভাবে কোনো কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফিল্ড অফিসার এবং সহকারী পরিচালকের পদ শূন্য থাকায় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে উপকরণ বা নিদর্শন সংগ্রহের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি মেরামতের জন্যও আঞ্চলিক অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, কারণ টিকিট বিক্রির টাকা রাজস্ব তহবিলে জমা দিতে হয়।

জনসাধারণ ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া

জাদুঘর পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীরা হতাশ। একজন দর্শনার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ডিজিটাল যুগে এসেও জাদুঘরের আধুনিকায়ন নেই। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই। দেখে মনে হয়, এটি একটি পরিত্যক্ত ভবন।”

খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক জীতেন চাকমা বলেন, “একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলেও জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে সমন্বয় থাকলে জাদুঘর অনেক সমৃদ্ধ হতো।”

বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা সুরেশ মোহন ত্রিপুরা বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলতে প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন। জাদুঘরে যেসব নিদর্শন রয়েছে, সেগুলো বছরের পর বছর ধরে একইভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের মং রাজ পরিবারের সদস্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য কুমার সুইচিং প্রু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মং রাজ পরিবারের কিছুই জাদুঘরে সংগ্রহে রাখা হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটি কেবল একটি ভবন নয়, এটি বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে এই জাদুঘরটি ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। অবিলম্বে জাদুঘরটির দিকে নজর না দিলে, এটি কেবল একটি জরাজীর্ণ ভবন হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।

পাঠকপ্রিয়