মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কৌশল আর সাহসিকতা: মিরসরাইয়ে যেভাবে লড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট বর্ডার হয়ে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন মাস্টার। উপজেলার মায়ানি ইউনিয়নের পশ্চিম মায়ানি গ্রামের এই বীর সেনানী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন, জানিয়েছেন কীভাবে নিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

আবদুর জব্বার হাজি বাড়ির নুর আহম্মেদের সন্তান আবুল হোসেন মাস্টার জানান, প্রশিক্ষণ শেষে এলাকায় ফিরে তারা দলবদ্ধ হন। একদিন বাজারে গিয়ে আলু-মাছ কিনে সেখানেই ফেলে খবর দেন, এলাকায় হানাদার বাহিনী ঢুকেছে। সবাইকে নিয়ে অবস্থান নিলেও ফায়ারের নির্দেশনা দেন শুধু নিজে। সারিবদ্ধ আর্টিলারি গাড়ি দেখেও তারা পিছু হটেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের দলের নুরুল মোস্তফা ধরা পড়েন এবং হাইস্কুলের পেছনের পুকুর পাড়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেধাবী ছাত্র মোস্তফাই ছিলেন তাদের গ্রুপের প্রথম শহীদ।

স্মৃতিচারণে আবুল হোসেন মাস্টার বলেন, মোস্তফার শহীদ হওয়ার পর তারা উত্তরদিকে ছড়িয়ে যান। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে পূর্বদিকে একা হয়ে গিয়ে তিনি আবুতোরাব এলাকায় রাতভর কচুরিপানার ডোবায় লুকিয়ে ছিলেন। পাক বাহিনীর বুটের আওয়াজ শুনে মুখ লুকিয়ে ছিলেন, পরে উঠে দেখেন শরীর সাদা হয়ে গেছে, পুরো শরীরে শামুক।

তিনি আরও জানান, পাকবাহিনী বাজার ত্যাগ করার পর তারা আবুতোরাব বাজারে গিয়ে মোস্তফার মৃত্যুর খবর পান। এরপর মায়ানি হয়ে সাধুরবাজার গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা অহিদুল হকের দলের সাথে একত্রিত হয়ে পাক বাহিনীর উপর হামলা চালান, যেখানে অনেক শত্রুসেনা নিহত হয়। সেখান থেকে আবার মায়ানিতে আশ্রয় নিয়ে ডোমখালী যান। বড় দারোগারহাট থেকে পাক বাহিনীর আসার খবর পেয়ে অস্ত্র স্বল্পতা সত্ত্বেও তাদের “ডিস্টার্ব” করার কৌশল নেন, যাতে শত্রুরা আতঙ্কে থাকে।

বিজয়ের একমাস আগে আবুতোরাব বাজারের পূর্বপাশে পাক বাহিনীর সাথে বড় আকারের যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধা শাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে তারা তুমুল যুদ্ধ করেন এবং পাকবাহিনীকে পরাস্ত করেন। এটিই ছিল তাদের শেষ যুদ্ধ।

তবে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও আক্ষেপ ঝরে পড়ে আবুল হোসেন মাস্টারের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “আমরা যে দেশটা চেয়েছিলাম তেমন দেশ আসলে হয়নি। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের স্বাধীনতা আজও এদেশের মানুষ পায়নি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসে বড় আফসোস হয়। কেন মুক্তিযুদ্ধ করলাম? মুক্তিযুদ্ধের যে উদ্দেশ্য সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।” দেশের রাজনীতিবিদদের শুদ্ধাচারী হয়ে দেশের সেবায় আত্মত্যাগের মানসিকতা তৈরির আহ্বান জানান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

পাঠকপ্রিয়