দেশে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় বয়স্ক ভাতার জি-টু-পি (সরকার থেকে ব্যক্তি) পদ্ধতি নিয়ে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিশিষ্টজনরা বলছেন, এসব তথ্য ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে। গবেষণায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বয়স্ক ভাতা বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত এ গবেষণায় উঠে এসেছে, ৯৮ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তি মনে করেন ‘বয়স্ক ভাতা’ সমাজে তাদের সম্মান বাড়িয়েছে। ৭৩.১৪ শতাংশ প্রবীণ জানিয়েছেন, এ ভাতার কারণে সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণের হার বেড়েছে।
“সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে ‘বয়স্কভাতা জিটুপি পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিতরণ: একটি মূল্যায়নধর্মী সমীক্ষা’” শীর্ষক গবেষণাটি চট্টগ্রাম বিভাগের ছয়টি ইউনিয়ন ও দুইটি ওয়ার্ডে পরিচালিত হয়। ৩৫০ জন ভাতাভোগীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দেখা যায়, ৪১.১ শতাংশ প্রবীণের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব বেড়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জি-টু-পি পদ্ধতিতে ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে। ৭০.৫৭ শতাংশ প্রবীণ মনে করেন, এ পদ্ধতিতে ভাতা আত্মসাতের সুযোগ নেই। ৯৬.৭১ শতাংশ প্রবীণ জি-টু-পি ব্যবস্থাকে ইতিবাচক ও সহজ মনে করেন।
গবেষণায় বিভাগভিত্তিক বয়স্ক ভাতা বিতরণের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৬২ জন, চট্টগ্রামে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৭১ জন, খুলনায় ৭ লাখ ২০ হাজার ৮২৪ জন, রাজশাহীতে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৪ জন, রংপুরে ৮ লাখ ৫১ হাজার ৯০০ জন, বরিশালে ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬১ জন, ময়মনসিংহে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৩ জন এবং সিলেটে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৫ জন প্রবীণ বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয় পরিচালিত এ গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালানো এ গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি জমা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার পরিচালক মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ বলেন, “এ গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ। কর্মসূচির মানোন্নয়নে এটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।”
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মোশাররফ হোসেন বলেন, “গবেষণায় উঠে আসা তথ্যগুলো ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে। ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য আলাদা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “জি-টু-পি প্রক্রিয়ায় ভাতা বিতরণের ফলে প্রতারণার সুযোগ কমেছে। বয়স্ক ভাতা প্রবীণদের পারিবারিক ও মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছে।”
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক কাজী নাজিমুল ইসলাম গবেষণার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “এর মাধ্যমে প্রবীণদের আসল চিত্র ফুটে উঠেছে, যা প্রশংসার দাবিদার।”
সাম্প্রতিক গবেষণায় বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও প্রবীণবান্ধব করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে এসেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা, যাতে এটি প্রবীণদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আরও সহায়ক হয়। বয়স্ক ব্যক্তির বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বয়সসীমা থেকে ভিন্ন। প্রবীণদের জীবনযাত্রায় বৈচিত্র্য আনতে বিনোদন ও উৎসব উপলক্ষে বিশেষ ভাতা প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী প্রবীণদের জন্য বিশেষ সহায়ক উপকরণ প্রদানের কথাও বলা হয়েছে, যাতে তাদের জীবন আরও সহজ হয়। প্রবীণদের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করতে কেয়ার গিভার সার্ভিস এবং জেরিয়াট্রিক্স সার্ভিস (বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যসেবা) চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। জিটুপি (G2P) পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা জোরদার করা, ভাতাভোগীদের নিজস্ব মোবাইল ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং নিবন্ধিত সিমের মাধ্যমে ভাতা বিতরণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোপরি, প্রতারণা রোধে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন করার মাধ্যমে বয়স্ক ভাতার অর্থ সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যক্তি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। জি-টু-পি পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও প্রতারণার অভিযোগ উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে।