সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আশিকুর রহমান লস্কর: পুঁজি ছাড়াই কইয়ের তেলে কই ভেজে বিদেশে সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আশিকুর রহমান লস্কর কোনো পুঁজি ছাড়াই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছেন। ‘কইয়ের তেলে কই ভাজা’র মতো জাহাজ আমদানির নামে প্রতারণা করে তিনি দুবাই ও কানাডায় গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।

জানা যায়, আশিকুর রহমান লস্কর পুরনো জাহাজ আমদানির নামে দেশের ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন। এই ঋণের বিপরীতে যে সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়েছে, তার মূল্য ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার বেশি নয়। ঋণের টাকা তিনি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা, লাইবেরিয়া এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো কর ফাঁকির স্বর্গরাজ্যে পাচার করেন। পরে তা দুবাই ও কানাডায় স্থানান্তর করে বিলাসবহুল সম্পত্তি কেনেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের (সিফোরএডিএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুবাইয়ে আশিকুর রহমান লস্করের ৬২টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ভিলা রয়েছে, যা বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ, কেম্পিনস্কি হোটেল এবং ওয়াদি আল সাফা-৭-এর মতো ব্যয়বহুল এলাকায় তার এসব সম্পত্তি অবস্থিত। এছাড়া কানাডার টরন্টোতেও তার তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০১৮ সালে আশিকুর রহমানের অর্থ পাচার নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এবি ব্যাংকের কর্মকর্তারা লস্করের মালিকানাধীন মাহিন এন্টারপ্রাইজ ও গ্র্যান্ড ট্রেডিংয়ের নামে জাহাজ আমদানির এলসির ক্ষেত্রে নিয়ম মানেননি। বারবার এলসির বিপরীতে বিদেশে অর্থ পাঠানো হলেও আমদানির কোনো দায় পরিশোধ করা হয়নি।

বিস্ময়করভাবে, অর্থ পাচারের বিস্তর প্রমাণ থাকলেও লস্করের নাম সরকারি কোনো তদন্ত তালিকায় নেই। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতের বড় অপরাধীদের ধরতে এবং পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য যে ১১টি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে, তাদের তালিকাতেও লস্করের নাম নেই।

আশিকুর রহমান লস্করের বাবা ছিলেন মেরিন সার্ভেয়ার। ২০০০ সালে ভোগ্যপণ্য ব্যবসা দিয়ে শুরু করলেও ২০০৬ সালে জাহাজভাঙা ব্যবসায় যুক্ত হন আশিকুর। বাবার ব্যবসার হাল ধরে তিনি ভুয়া নথিপত্রের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতে জড়িয়ে পড়েন। এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ফয়সাল মোরশেদ খানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।

২০১৩ সালে মেঘনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক হন লস্কর। ঋণখেলাপির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি দুবাই হয়ে কানাডায় পালিয়ে যান।

সমকালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, লস্কর তার নিজের ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৯টি ঋণপত্র খোলেন। নানা অজুহাতে তিনি ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেননি। ফলে এবি ব্যাংক তার নামে ‘ফোর্স ঋণ’ সৃষ্টি করে বিদেশি ব্যাংকের দায় সমন্বয় করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লস্কর যেসব বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে জাহাজ আমদানি দেখিয়েছেন, প্যারাডাইস পেপারসের মতো প্রতিবেদনে তাদের অনেকের নাম অর্থ পাচারে সহায়তাকারী হিসেবে এসেছে।

এবি ব্যাংক লস্করকে ঋণ সুবিধা দিতে গিয়ে নানা অনিয়ম করেছে। মধ্যরাতেও এলসি খোলার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি কর্মচারীর নামে ৬৭০ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে।

দুদক ২০২১ সালে লস্করের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের প্রমাণ পেলেও ২০২২ সালে তাকে ক্লিন সনদ দেয়।

লস্করের প্রতারণার কারণে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প এখন ধুঁকছে। ব্যাংকগুলো এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আশিকুর রহমান লস্করের কাছে এবি ব্যাংকের পাওনা ১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এছাড়া ঢাকা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছেও লস্করের ঋণ রয়েছে।

ইতোমধ্যে ঢাকা ব্যাংক ও ফিনিক্স ফাইন্যান্স আদালতের মাধ্যমে লস্করের কিছু সম্পত্তির মালিকানা পেয়েছে। তবে এবি ব্যাংক সম্পত্তি বিক্রির নিলাম ডেকেও কোনো সাড়া পায়নি।

এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক দিদারুল আলম বলেন, ‘ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশিকুর রহমান লস্করের সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ করতে পারছি না।’

ঢাকা ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর লস্করের খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর চেষ্টা করছেন। দেশীয় সম্পদ বিক্রি করে যতটা সম্ভব ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলছেন, বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার হলে গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যাংককেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

লস্করের বক্তব্য নেওয়ার জন্য ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

পাঠকপ্রিয়