চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে প্রতি বছরের মতো এবারও রমজান মাস জুড়ে আয়োজিত হচ্ছে এক বিশাল ইফতারের মিলনমেলা। সুদীর্ঘ ২৪ বছর ধরে চলমান এই আয়োজন যেন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য এক স্বর্গীয় শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়।
পবিত্র রমজানের প্রথম দিন থেকেই প্রায় দুই হাজার রোজাদার এখানে সমবেত হন ইফতারের জন্য। মসজিদের খতিব মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল-মাদানীর তত্ত্বাবধানে এই বিশাল আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে। তাঁরই উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে এই মসজিদে রোজাদারদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়, যা ২০০৭ সাল থেকে আরও বৃহৎ পরিসরে রূপ নেয়।
১৬৬৭ সালে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদে ইফতার যেন এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি করে। সারি সারি মানুষ, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসে অপেক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য। সামনে সাজানো খেজুর, ছোলা, চমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, মুড়ি, অন্তত ও জিলাপির মতো চেনা ইফতার সামগ্রী। সাথে থাকে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য শরবত।
এখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো উঁচু-নিচুর পার্থক্য। সবাই এক কাতারে বসে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে। রিকশাচালক কুতুব আহমেদ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সেলিম – সবাই এখানে এসে খুঁজে পান এক স্বর্গীয় আনন্দ। কুতুব আহমেদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এই ইফতার যেন এক টুকরো শান্তির আশ্রয়। আবার সেলিমের মতো স্বচ্ছল মানুষেরা এখানে এসে অনুভব করেন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অকৃত্রিম বন্ধন।
ইফতারের আগে রোজার ফজিলত নিয়ে আলোচনা ও মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতে অংশ নিয়ে অগণিত রোজাদার আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আকুতি জানান। সবার চোখে-মুখে তখন এক স্বর্গীয় আভা, যেন প্রতিটি হৃদয় একাকার হয়ে মিশে গেছে আল্লাহর প্রেমের মহাসাগরে।
এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে কাজ করে চলেছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। ১২ জন বাবুর্চি অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি করেন ইফতার সামগ্রী। আর ২৫ জন স্বেচ্ছাসেবক হাসিমুখে সেগুলো পৌঁছে দেন রোজাদারদের হাতে।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের এই ইফতার আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মিলন ও ভালোবাসার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়, এটি ত্যাগ, সংযম ও ভ্রাতৃত্বের মাস।