সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সিডিএ’র অনন্যা আবাসিক: ১৭ বছরেও গড়ে ওঠেনি স্বপ্নের বসতি, প্লট মালিকদের হতাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম শহরের কোলাহল থেকে দূরে, অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়কের পাশে মনোরম পরিবেশে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর অনন্যা আবাসিক প্রকল্প। ২০০৮ সালে এই প্রকল্পের অধীনে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১,৭৩৩টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দের প্রায় দেড় যুগ পরেও প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে এক বিরানভূমিতে। হাতেগোনা কয়েকটি প্লট ছাড়া বাকিগুলো এখনো ফাঁকা। প্লট মালিকদের অনেকেই বলছেন, সিডিএ-এর অবহেলা ও পরিকল্পনার অভাবেই তাদের স্বপ্নের বসতি আজও অধরা।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়। ২০০৮ সালে প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সে সময় প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সিডিএ। শুরুতে এই আবাসিক এলাকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের অধিকাংশ প্লট এখনো খালি পড়ে আছে। কোথাও কোথাও ঘাস ও আগাছার জঙ্গল। বিদ্যুতের খুঁটি থাকলেও অনেক স্থানে তার ছেঁড়া বা ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। রাস্তাঘাট এবড়োখেবড়ো, নেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। রাতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন স্থানীয়রা।

সোসাইটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সিডিএ প্লট বরাদ্দের পর থেকে প্রকল্পের উন্নয়নে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। প্লট বরাদ্দের পরবর্তী সময়ে সিডিএ-এর পক্ষ থেকে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হয়নি।

অনন্যা আবাসিকের রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানিসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে প্লট মালিকরা সেখানে বসবাস করার মতো পরিবেশ পাচ্ছেন না।

প্রকল্প এলাকার চারপাশে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। প্লট মালিকদের পক্ষ থেকে পুলিশ ফাঁড়ি ও আনসার ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানানো হলেও, তা এখনো পূরণ করা হয়নি। এতে করে সেখানে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা রয়ে গেছে।

প্লট হস্তান্তরের সময় সিডিএ প্লট মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত উন্নয়ন ফি আদায় করেছিল। তবে, আদায়কৃত সেই ফির বিপরীতে প্রকল্পের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। এতে করে অনেক প্লট মালিক হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং তাদের অনেকেই এরই মধ্যে প্লট বিক্রি করে দিয়েছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে অনন্যা হাউজিং ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে ১৮ দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করা হয়। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের সার্বিক উন্নয়ন ও বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নত করার বিভিন্ন বিষয়।

স্মারকলিপিতে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, অনন্যা আবাসিক এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি এবং একটি আনসার ক্যাম্প স্থাপন করে নিরাপত্তা জোরদার করা।

আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন সিটি কর্পোরেশন করতে পারে।

প্লট মালিকদের পক্ষ থেকে দ্রুত রাস্তাঘাট সংস্কার এবং নতুন রাস্তা নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে, যাতে করে আবাসিকে বসবাস করা সহজ হয়।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সিডিএ-কে অনুরোধ করা হয়েছে, যা একটি আধুনিক আবাসিকের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

আবাসিক এলাকায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে পরিবেশ দূষণ রোধ করা যায় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়।

এছাড়া, বাসিন্দাদের জন্য মসজিদ, খেলার মাঠ এবং কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের দাবিও জানানো হয়েছে, যাতে একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম প্লট মালিকদের ভবন নির্মাণ না করার বিষয়টিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্লট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

অনন্যা আবাসিকের বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে প্রকল্পটি কখনই আলোর মুখ দেখবে না। সিডিএ-এর সদিচ্ছা ও দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে প্লট মালিকদের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে।

অনন্যা আবাসিক প্রকল্প নিয়ে প্লট মালিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সিডিএ-এর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক থাকায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, সিডিএ কর্তৃপক্ষ প্লট মালিকদের দাবি কতটা গুরুত্ব দেয় এবং কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করে।

পাঠকপ্রিয়