সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

রমজানেও তেলের তেলেসমাতি: বাজারে সংকট, জাহাজে মজুত!

নিজস্ব প্রতিবেদক

রমজান মাসে বাড়তি চাহিদার বিপরীতে প্রচুর পরিমাণে সয়াবিন তেল ও সয়াবিন বীজ (সিড) আমদানি হলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ সয়াবিন সিড খালাস না করে বিভিন্ন গন্তব্যের পথে জাহাজে ফেলে রাখায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং চলমান সংকট নিরসন হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও খালাস না হওয়া সয়াবিন সিডের পরিমাণ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৫০ টন। একসময় ভোজ্যতেলের বাজারে অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে এই বাজার। এস আলম গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও এক্ষেত্রে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ফ্রেশ গ্রুপ ও বিশ্বাস গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সয়াবিন সিড আমদানি করলেও, তার একটি বড় অংশ এখনো জাহাজে অপেক্ষমান।

বিশ্বাস গ্রুপের ৪৪টি এবং ফ্রেশ গ্রুপের ১২টি সয়াবিন সিড বোঝাই লাইটারেজ জাহাজ বিভিন্ন নদী বন্দরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এসব সিড থেকে তেল উৎপাদন করা হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে সয়াবিন তেলের চাহিদা বাড়লেও আমদানিকৃত কাঁচামাল বন্দরে পড়ে থাকায় সরবরাহ কমে যাচ্ছে, ফলে দাম বাড়ছে। জানুয়ারি মাসে চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। এছাড়া, একই সময়ে আমদানি করা ৩ লাখ টন সয়াবিন বীজ থেকে প্রায় ৪৫ হাজার টন তেল উৎপাদিত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও প্রচুর পরিমাণে তেল আমদানি হয়েছে। রমজানের প্রথম সপ্তাহেও প্রায় ৫০ হাজার টন তেল এসেছে।

এত তেল আমদানির পরও বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে আমদানিকৃত সয়াবিন বীজ থেকে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি এই তেল উৎপাদন করে এবং উপজাত পণ্য হিসেবে মৎস্য ও পশুখাদ্য তৈরি করে। সাধারণত, ১ টন সয়াবিন বীজ থেকে ১৮০ থেকে ২০০ কেজি তেল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ সয়াবিন সিড পরিবহন করেছে।

অবৈধ মজুতদারি, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরবরাহ চেইনের সমস্যাকে সয়াবিন তেলের সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এমতাবস্থায়, জাহাজে থাকা কাঁচামাল দ্রুত খালাসের মাধ্যমে সরবরাহ বৃদ্ধি করে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। রমজানে এই চাহিদা ৩ লাখ টন। আমদানির পরিমাণ চাহিদার কাছাকাছি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতির দিকে থাকায় স্থানীয় বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ-এর মতে, তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাজারে নজরদারির অভাব দেখা দিয়েছে। কী পরিমাণ তেল প্রয়োজন এবং কী পরিমাণ আসছে, তা সঠিকভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও, বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধি পাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।

পাঠকপ্রিয়