সরকারি ও বেসরকারি খাতের অন্তত ১৬টি ব্যাংক ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক সংগৃহীত আমানতের চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, যা ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট বৃদ্ধির পাশাপাশি আমানতকারীদের জন্যেও ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে দ্রুত এডিআর (অগ্রিম-আমানত অনুপাত) সীমা কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৮৭% এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯২% পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারে। কিন্তু ডিসেম্বর (২০২৩) মাসের হিসাব অনুযায়ী, ১৬টি ব্যাংক এই সীমা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭টি ইসলামী এবং ৯টি প্রচলিত ধারার ব্যাংক।
উল্লেখযোগ্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (ইসলামি), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এদের মধ্যে আটটি ব্যাংকের এডিআর ১০০% ছাড়িয়ে গেছে, অর্থাৎ তারা আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, “এডিআর লঙ্ঘনের মূল কারণ সাম্প্রতিক সময়ে আমানত উত্তোলন বৃদ্ধি। ব্যাংকগুলো নতুন করে বেশি ঋণ দেয়নি, বরং আমানত কমে যাওয়ার কারণে এডিআর বেড়ে গেছে।”
তিনি আরও জানান, ব্যাংকগুলোকে দ্রুত এডিআর সমন্বয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ঋণ আদায়, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ে জোরদার পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অন্যথায়, ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ক্যাশেলস রেটিংয়ের নম্বর কমানোসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক সর্বোচ্চ ১১৩.৫৬% এডিআর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এডিআর সর্বোচ্চ ১২৮.৫৩%।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ জানান, “আগে থেকেই ব্যাংকের এডিআর বেশি ছিল। গ্রাহকদের টাকা তোলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমানত কমছে, কিন্তু ঋণের পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে। ঋণ আদায় না হওয়ায় এডিআর সীমা বেড়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা ঋণ আদায়ে জোর দিচ্ছি এবং আশা করছি দ্রুত এডিআর কমিয়ে আনতে পারব।”
উল্লেখ্য, কোভিড মহামারীর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক দফায় এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়েছিল। মহামারীর প্রভাব মোকাবেলায় ২০২০ সালের এপ্রিলে এডিআর সীমা কিছুটা বাড়িয়ে প্রচলিত ধারার ব্যাংকের জন্য ৮৭% এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকের জন্য ৯২% নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত এডিআর সীমা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত এবং আন্তর্জাতিক মানের। এই সীমা অতিক্রম করা ব্যাংক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে আমানতকারীদের জন্য। কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যায় পড়েছে।