সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

শজনে চাষ: স্বল্প খরচে অধিক লাভ, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি জীবনযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়জুড়ে এখন শজনের রাজত্ব। চৈত্রের রোদে ঝলমল করছে সারি সারি শজনে বাগান। ডাঁটায় নুয়ে পড়েছে গাছগুলো। ফলন হয়েছে বাম্পার। চাষিদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের ঝিলিক।

ওয়াগ্গা ইউনিয়নের উত্তর দেবতাছড়ি, ছোট পাগলী, বড় পাগলী ও দক্ষিণ দেবতাছড়ি গ্রামের পাহাড়গুলোতে এখন শুধুই শজনে চাষ। এর মধ্যে উত্তর দেবতাছড়িতে ৭২টি পরিবারের ৯০ শতাংশেরই আয়ের মূল উৎস এই শজনে।

স্থানীয় চাষি বিমল চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা জানান, গ্রামের প্রায় সবাই শজনে চাষ করেন। তিনি নিজে এ বছর দুই লাখ টাকার বেশি ডাঁটা বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন। গত বছর তিনি আড়াই লাখ টাকার ডাঁটা বিক্রি করেছিলেন। কাউখালীর ঘাগড়া ইউনিয়নের চেলাছড়া উপরপাড়ার বুদ্ধ কুমার চাকমাও চলতি বছর তিন লাখ টাকার শজনে বিক্রির আশা করছেন।

ওয়াগ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিরঞ্জিত তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তার ইউনিয়নের চারটি পাহাড়জুড়ে শজনের বাগানগুলোতে ব্যাপক ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে ডাঁটা বিক্রির ধুম পড়েছে। এলাকার প্রায় সবারই শজনে বাগান রয়েছে।

শজনে (বৈজ্ঞানিক নাম _Moringa oleifera_) গাছের ফল, ফুল, পাতা ও শিকড় খাদ্য এবং ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ডাঁটা জনপ্রিয় সবজি। শজনে পাতার পুষ্টিগুণ ও বলবর্ধক হিসেবে চাহিদার কারণে ইদানীং শজনে পাতার চা ও তেল তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শজনে গাছের চাষ হয়।

চাষিরা জানান, শজনে গাছের বিশেষত্ব হলো, একবার লাগালে বহু বছর ফলন পাওয়া যায়। সার, কীটনাশক বা বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে শুরু হয়ে জুলাই মাস পর্যন্ত ডাঁটা ও পাতা সংগ্রহ চলে। শুকনা শজনে পাতা প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

দেবতাছড়ি, রামপাহাড়, সাপছড়ি ও ছোট পাগলী পাহাড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা শজনে ডাঁটার জন্য ভিড় করছেন। প্রতিদিন ট্রাকে করে এসব ডাঁটা যাচ্ছে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ডাঁটা ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম কিছুটা কমে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কাপ্তাই কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শজনে চাষে খরচ কম, লাভ বেশি। চলতি বছর কাপ্তাই উপজেলায় ৬৩ একর জমিতে শজনের চাষ হয়েছে। এখান থেকে ৫০০ মেট্রিক টন ডাঁটা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো শজনে গাছ থেকেও উৎপাদন হচ্ছে। কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় শজনে চাষ বাড়ছে।

কাপ্তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান আহমেদ জানান, পাহাড়ে শজনে চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। ডাঁটা ও পাতা বিক্রি করে প্রতিবছর ভালো আয় করা সম্ভব। চলতি বছর কাপ্তাইয়ে ৬৩ একর জমিতে শজনের ফলন হয়েছে এবং ৫০০ মেট্রিক টন ডাঁটা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সার্বিক বিবেচনায়, কাপ্তাইয়ের শজনে চাষিদের মুখে এখন সাফল্যের হাসি। শজনে চাষের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পাঠকপ্রিয়