কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামের তিন বন্ধু সিরাজুল মোস্তফা, বাবুল মিয়া এবং শামশুল আলম। তাঁরা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে মাছের ব্যবসা করতেন, কিন্তু ব্যবসায় লাভ না হওয়ায় তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন। নতুন কিছু করার আশায় তাঁরা একত্রিত হন। সামনে গরমকাল এবং রোজার মাস, তাই তরমুজ চাষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাঁদের সামনে বড় সমস্যা ছিল জমি নির্বাচন। এলাকার অধিকাংশ জমিই লবণ চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়, এবং এই লবণাক্ত জমিতে অন্য কোনো ফসল চাষ করা কঠিন।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা এক কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে লবণাক্ত জমিতেই তরমুজ চাষ করার সাহসী পদক্ষেপ নেন। তাঁরা কাটাখালী গ্রামের পাশে নাফ নদীর তীরবর্তী চার কানি (১৬০ শতক) জমি বর্গা নেন। এই জমিগুলো সাধারণত লবণ চাষের মৌসুম শেষে খালি পড়ে থাকত, কারণ লবণাক্ততার কারণে এখানে ধান বা অন্যান্য সবজি চাষ করা সম্ভব হতো না।
তিন বন্ধু মিলে প্রায় ১২ হাজার তরমুজের চারা রোপণ করেন। তাঁরা পাকিজা ও চ্যাম্পিয়ন নামের দুটি উন্নত জাতের তরমুজের বীজ ব্যবহার করেন। সঠিক পরিচর্যা এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে প্রতিটি চারাতেই তরমুজ ধরে। প্রতিটি তরমুজের আকারও ছিল বেশ বড়, প্রায় ৮ থেকে ১২ কেজি।
ফাল্গুন মাসের শুরুতেই গরম বাড়ায় বাজারে তরমুজের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। রোজার মাসে এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়। ফলে, তিন বন্ধু তাঁদের উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে ভালো লাভ করতে সক্ষম হন। তাঁরা জানান, প্রতিটি তরমুজ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে। টেকনাফ, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং বাজারের ব্যবসায়ীরা তাঁদের কাছ থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে যান। এছাড়াও, কক্সবাজার শহরের দোকানগুলোতেও তাঁরা তরমুজ সরবরাহ করেছেন।
ইতোমধ্যেই তাঁরা খেত থেকে প্রায় আট লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। এখনও খেতে প্রায় দুই লাখ টাকার তরমুজ রয়েছে। তিন বন্ধুর তরমুজ খেত দেখতে গেলে দেখা যায়, মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার তরমুজ। শ্রমিকেরা গাছ থেকে পাকা তরমুজ সংগ্রহ করে বস্তায় ভরছেন।
তাঁরা জানান, জমির বর্গা, বীজ, সার এবং শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তাঁদের প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে, তাঁরা মাছের ব্যবসা ছেড়ে এই নতুন উদ্যোগে এসে সফল হয়েছেন। তাঁদের এই সাফল্যে এলাকার অন্যরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ থেকে তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁরা আরও বেশি জমিতে তরমুজ চাষ করার পরিকল্পনা করছেন। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, তিন বন্ধুর এই সাফল্য দেখে এলাকার বেকার যুবকরাও তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাকিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে টেকনাফে প্রায় ২৭৫ জন কৃষক ১১৩ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন এবং সকলেই লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই তিন বন্ধুর সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং সাহসের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। তাঁদের এই উদ্যোগ লবণাক্ত জমিতে ফসল ফলানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যান্য কৃষকদের জন্যেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।