বাংলাদেশের বনভূমি রক্ষায় সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে বনভূমি বরাদ্দ দেওয়ায় একদিকে যেমন বন উজাড় হচ্ছে, তেমনি হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য। গত তিন দশকে প্রায় ৪৫টি সরকারি সংস্থাকে ১ লাখ ৬১ হাজার একর বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা বন সংরক্ষণ নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখল করে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন। এই সংস্থাটি সারাদেশে ৫৩ হাজার ৫৭৯ একর বনভূমি দখলে রেখেছে, যার মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই রয়েছে ৪৩ হাজার ৯৫ একর। কক্সবাজারে সামরিক বাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, র্যাব এবং বিজিবি-র মতো সংস্থাগুলোর অধীনে রয়েছে ৯৩ হাজার ৯২৩ একর বনভূমি। এছাড়া, মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় দেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি।
শুধু কক্সবাজার নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সরকারি সংস্থাগুলো বনভূমি বরাদ্দ পেয়েছে। গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩০টি সরকারি সংস্থা বনভূমি পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৬ হাজার ৭০০ একর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নোয়াখালীতে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (২৭ হাজার ৬৯৮ একর), টাঙ্গাইল (১৪ হাজার ৯৯৩ একর), কক্সবাজার (১৪ হাজার ২৩২ একর) এবং সিলেট (৯ হাজার ১৫৬ একর)।
জাতীয় বননীতির ১৯ নম্বর ঘোষণায় স্পষ্ট বলা আছে, সরকারি মালিকানাধীন বনভূমি বনায়ন ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এই বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা আইন ও নীতির পরিপন্থী।
বিভিন্ন সময় পরিবেশবাদীদের আপত্তি সত্ত্বেও বনভূমি বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মৌলভীবাজারের জুড়ীর লাঠিটিলা বনে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’ নির্মাণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালে অনুমোদন দিয়েছিল। যদিও এই প্রকল্পটি পরে বাতিল করা হয়। একইভাবে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাডেমি অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ নির্মাণের জন্য ৭০০ একর বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়। বাফুফে-কে দেওয়া হয়েছিল কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের পাশে ২৫ একর সংরক্ষিত বন, যা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
কক্সবাজারের দরিয়ানগরে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটিকে পাঁচ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরি নির্মাণ করা হয়েছে, যা মূলত শর্তের বাইরে ছিল। এছাড়া, কক্সবাজারে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানকে বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে নিয়ম না মেনে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি, ফেরতের শর্তে দেওয়া জমিতেও স্থাপনা নির্মাণ ও চিংড়ি চাষের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের ১০ হাজার ৬৪৬ একর জমি বিভিন্ন সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই শালবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের জন্যেও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধান বন সংরক্ষক জানিয়েছেন, সম্প্রতি প্রায় ৩১ হাজার ৬১৫ একর বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে এবং আরও জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে, বনভূমি দখলের ঘটনা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বনভূমি কমে যাওয়ার ফলে বন্যপ্রাণী আজ খাদ্য ও আবাসস্থলের অভাবে বিপন্ন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এবং আরও অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। দেশের ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য হলেও, বর্তমানে বন আচ্ছাদিত এলাকা মোট ভূমির প্রায় ১২.৮ শতাংশ।
বন অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক মদদে বনভূমি দখলের ঘটনা ঘটছে। এতে পুরো বনভূমি এবং এর ওপর নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্র বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনভূমিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে বিভিন্ন সংস্থার নামে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া জরুরি। তারা বনভূমি রক্ষায় সরকারের কাছ থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ আশা করছেন।
বন অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক এবং আইইউসিএন-এর সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, অধিকাংশ বনভূমি দখলের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাঁর মতে, বনের অভ্যন্তরে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলে তা সমগ্র বনভূমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে। তিনি আরও বলেন যে, উন্নয়নের প্রয়োজনে যদি বনভূমি বরাদ্দ দিতেই হয়, তাহলে এর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা অপরিহার্য। কারণ, একবার বন উজাড় হয়ে গেলে সেই ভূমির এতই অবনতি ঘটে যে, সেখানে আগের দশগুণ গাছ লাগিয়েও সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বনভূমিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেই বিভিন্ন সংস্থার নামে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, সকল বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বনভূমি উদ্ধারে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন সংস্থার নামে দেওয়া বরাদ্দ বাতিল করা হচ্ছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, দখলদার যেই হোক না কেন, যত প্রভাবশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।