মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

১২ জনের স্বেচ্ছায় সনদ প্রত্যাহারের আবেদন

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের স্তূপ মন্ত্রণালয়ে, যাচাই-বাছাইয়ে হিমশিম

নিজস্ব প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বর্তমানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংক্রান্ত অভিযোগের পাহাড়ে চাপা পড়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সারা দেশ থেকে ২০ হাজারের অধিক অভিযোগ জমা পড়েছে, যা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। এসব অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলো ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরি গ্রহণ এবং অন্যান্য সুবিধা ভোগের ঘটনা। মূলত রণাঙ্গনের সম্মুখসারির যোদ্ধারাই এই বিপুল সংখ্যক অভিযোগ দায়ের করেছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে আসছেন।

জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আসছে, যা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভুয়া সনদ বাতিলের জন্য দাখিলকৃত আবেদনের সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে।

গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। সরকার গঠনের মাত্র ছয় দিন পর, ১৪ আগস্ট, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তালিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইয়ের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদনের জন্য ১০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এবং ১০ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ড ও এর নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।

উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তার দপ্তরে অভিযোগের স্তূপীকৃত ফাইল দেখিয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি সেলফ, টেবিল এবং আলমারি অভিযোগপত্রে পরিপূর্ণ। জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুনও নিশ্চিত করেছেন যে, অধিদপ্তরেও একই অবস্থা বিরাজ করছে, সেখানেও অভিযোগের পাহাড় জমেছে।

এই বিপুল পরিমাণ অভিযোগ যাচাইয়ের বিষয়ে উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত যত্ন সহকারে এবং ধীরে-সুস্থে যাচাই করা হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়রানির শিকার না হন। তবে, যারা অন্যায়ভাবে ভুয়া সনদ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুবিধা ভোগ করেছেন, তাদের সনদ বাতিলের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং দলীয় প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে বহু অমুক্তিযোদ্ধাকে সনদ দেওয়া হয়েছে, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান সমুন্নত রাখতেই ভুয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এবং এ লক্ষ্যে জামুকাকে প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে সরেজমিন শুনানি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অভিযোগের সঠিক এবং নিখুঁত তদন্ত নিশ্চিত করতে ঢাকায় শুনানির পাশাপাশি অভিযোগস্থলে গিয়ে সরেজমিন শুনানি করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যিনি অভিযোগ করেছেন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি বসিয়ে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হবে, যা প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মন্ত্রণালয় এবং জামুকার মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে দেশে প্রায় ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, জামুকার ধারণা অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি, এমনকি লক্ষাধিকও হতে পারে। জামুকা ১৯৯৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে প্রণীত ৮৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকাকে একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে অগ্রসর হতে চাইছে। বর্তমানে দেশে গেজেটভুক্ত মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ৫০ জন। এই পরিসংখ্যান এবং ১৯৯৪ সালের তালিকাকে বিবেচনায় নিলে, জামুকার হিসাব অনুযায়ী দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজারে পৌঁছাতে পারে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

প্রাপ্ত অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নানা উপায়ে ভুয়া সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শুধুমাত্র আত্মীয়তার সূত্রে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তি, অর্থের বিনিময়ে সনদ ক্রয়, এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের টিমের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে সনদ বাগিয়ে নেওয়া। অনেক অভিযোগকারী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া সনদ পাইয়ে দেওয়ার সুপারিশ করার অভিযোগ এনেছেন। এমনকি কিছু আবেদনে স্থানীয় কমান্ডারদেরকে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর ‘পেইড এজেন্ট’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

জামুকার সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা খ ম আমীর আলী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলগুলো রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এবং দলীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিতরণ করে মহান স্বাধীনতার অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। তিনি সরাসরি সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, তিনি টাকার বিনিময়ে ভুয়া সনদ দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছেন এবং তিনি নিজেও একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, যা বর্তমানে কেবিনেটে পর্যালোচনার পর কিছু সংশোধনীসহ ফেরত এসেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অধ্যাদেশটি চূড়ান্তভাবে সংশোধন হওয়ার পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শনাক্তকরণ এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করার পথে আর কোনো বাধা থাকবে না এবং কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

ইতিমধ্যে, সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১২ জন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ফেরত দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। এদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে অবসরেও গিয়েছেন। কেউ কেউ তাদের আবেদনে সনদ গ্রহণের বিষয়টি ভুল ছিল বলে উল্লেখ করে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। মন্ত্রণালয় এসব ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ তারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসায় সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে পারেন।

এর পাশাপাশি, সরকার গেজেটভুক্ত ৬,৭৫৭ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ১,৩৯৯ জনের পরিবারের সন্ধান করছে, যারা এখন পর্যন্ত কোনো ভাতা গ্রহণ করেননি বা এর জন্য আবেদনও করেননি।

উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম এ বিষয়ে বলেন, এই পরিবারগুলো কোথায় আছে এবং কেন তারা রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণ করছে না, তা রাষ্ট্রের জানা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই গ্রামের সাধারণ কৃষক-শ্রমিক হওয়ায়, তারা হয়তো সরকারের কাছে আবেদন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন। তাই রাষ্ট্রেরই উচিত তাদের খুঁজে বের করা। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একদিকে যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি প্রয়াস, অন্যদিকে এটি বাস্তবায়নের পথে এক বিশাল চ্যালেঞ্জও বটে।

পাঠকপ্রিয়