মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

৩৭ বছর ধরে সংরক্ষিত ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কুরআন: চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর অনন্য সংগ্রহ

তরিকুল হাসান

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পূর্ব মাদারবাড়ি মাঝিরঘাট এলাকার বাসিন্দা, ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী মো. আবছার উদ্দিন দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে সযত্নে সংরক্ষণ করে আসছেন একটি ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কুরআন শরীফ। বিশেষ নকশাখচিত এবং লক লাগানো একটি রুপার বাক্স খুললে দেখা মেলে এই অমূল্য ধর্মগ্রন্থটির। আবছার উদ্দিনের দাবি, এটি বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র কুরআন শরীফগুলোর একটি।

কুরআন শরীফটির দৈর্ঘ্য মাত্র দেড় ইঞ্চি, প্রস্থ এক ইঞ্চি এবং পুরুত্ব আধা ইঞ্চি। এর ওজন মাত্র সাড়ে আট গ্রাম। চামড়াসদৃশ বস্তু দিয়ে বাঁধানো মলাট এবং তিন দিকে সোনালি রঙের প্রলেপ এর সৌন্দর্য্য বাড়িয়েছে। প্রায় ছয় শতাধিক পৃষ্ঠার সম্পূর্ণ ৩০ পারার এই কুরআনটির মুদ্রণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুন্দর। ব্যবহৃত কাগজগুলো মসৃণ ও বিশেষায়িত, যা বর্তমানে প্রচলিত কাগজের চেয়ে ভিন্ন। এর বাইন্ডিং এতটাই মজবুত যে সেলাইয়ের সুতা খালি চোখে দেখা যায় না। ক্ষুদ্রাকৃতির কারণে এটি খালি চোখে পড়া বেশ কঠিন, তবে রুপার বাক্সটির সাথে সংযুক্ত আতশি কাচের সাহায্যে এর আয়াতগুলো স্পষ্ট পড়া যায়।

মো. আবছার উদ্দিন জানান, ১৯৮৮ সালে তিনি যখন নগরের বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, তখন এক রহস্যময় ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি এই কুরআন শরীফটি পান। স্কুলের টিফিন বিরতিতে মাদ্রাসার অদূরে রেললাইনের ধারে হাঁটার সময় আরব দেশের কথ্য ভাষার টানযুক্ত, সুঠাম দেহের এক ব্যক্তির সাথে তার পরিচয় হয়। লোকটি নিজের নাম মুগনিও ওসমান গণি বলে জানান। কয়েকদিন খাবার ও টাকা দিয়ে সাহায্য করার পর একদিন ওই ব্যক্তি আবছার উদ্দিনকে এই পবিত্র কুরআনের কপিটি উপহার দেন এবং পূর্বে নেওয়া টাকাও ফেরত দেন। সেই থেকে তিনি এটি পরম যত্নে আগলে রেখেছেন।

আবছার উদ্দিন এই কুরআন শরীফকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক ঘটনারও বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ২০০৮ সালের ১০ মে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাদের বাসস্থানসহ আশেপাশের কয়েকটি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু অলৌকিকভাবে যে কক্ষে কুরআন শরীফটি রাখা ছিল, সেটি সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে।

তিনি আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কিছুদিন আগে স্বপ্নে ওই রহস্যময় ব্যক্তি তাকে দুবার কুরআনটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। দ্বিতীয়বার কিছুটা রাগান্বিত স্বরে নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কুরআনটি অন্য একটি কক্ষে অত্যন্ত পবিত্রতা ও আদবের সাথে সংরক্ষণ করেন। এর সপ্তাহখানেক পরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে।

আবছার উদ্দিন মনে করেন, তার কাছে সংরক্ষিত এই কুরআন শরীফটি এতটাই অনন্য যে এটি বিশ্বের যেকোনো বিশেষায়িত জাদুঘরে সংরক্ষণের যোগ্য।

উল্লেখ্য, এর আগেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্রাকৃতির কুরআন শরীফের সন্ধান পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের রাউজানের চিকদাইর এলাকার নাজমুল নামে এক ব্যক্তির কাছেও এক ইঞ্চি দীর্ঘ একটি কুরআন সংরক্ষিত আছে।

এছাড়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সাল থেকে সংরক্ষিত একটি ক্ষুদ্র কুরআন রয়েছে যার দৈর্ঘ্য ১ ইঞ্চি, প্রস্থ ০.৭৫ ইঞ্চি, উচ্চতা ০.৭ মিলিমিটার এবং ওজন ২.৩৮ গ্রাম। ১৯৮২ সালে মিশর থেকে মুদ্রিত এবং বর্তমানে পাকিস্তানি নাগরিক মুহাম্মদ সাঈদ করিম বেবানি’র সংগ্রহে থাকা একটি কুরআনের দৈর্ঘ্য ০.৬৬ ইঞ্চি, প্রস্থ ০.৫০ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ০.২৮ ইঞ্চি বলে জানা যায়।

আবছার উদ্দিনের সংগ্রহে থাকা কুরআনটি এই ক্ষুদ্র ধর্মগ্রন্থগুলোর তালিকায় এক নতুন সংযোজন।

পাঠকপ্রিয়