দীর্ঘদিনের সংকট ও আস্থাহীনতার পর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গৃহীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপে মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করায় গত কয়েক মাসে এ খাতে আমানতকারী হিসাব ও মোট আমানতের পরিমাণ বেড়েছে। তবে, আশঙ্কাজনক হারে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট খাতটির টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮৭৫ জনে, যা একই বছরের জুন মাসের তুলনায় প্রায় ২৭ হাজার ৯৮৪ জন বেশি। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসেই নতুন আমানতকারী হিসাব বেড়েছে ২৬ হাজার ২৮৭টি।
একই সময়ে আমানতের পরিমাণেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ডিসেম্বর শেষে খাতটিতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর মাসের ৪৭ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১৯১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বেশি। এর আগের প্রান্তিকে যেখানে আমানত প্রায় ৬৮ কোটি টাকা কমেছিল, সেখানে এই বৃদ্ধিকে খাত সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
এর আগে, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই বছর এনবিএফআই খাত থেকে রেকর্ড সংখ্যক আমানতকারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৬৮টি হিসাব কমে যায়, যার ফলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৫ লাখ ৭০ হাজার ১৯৪ জন থেকে আমানতকারীর সংখ্যা গত জুনে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯১ জনে নেমে এসেছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা খাতটিতে গভীর সংকট তৈরি করে। পাশাপাশি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতিও সাধারণ আমানতকারীদের হিসাব বন্ধ করতে বাধ্য করে। তবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সুদ পাওয়ায় (বিশেষ করে সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর) আমানতকারীরা আবার এনবিএফআই খাতের দিকে ঝুঁকছেন।
আমানত বাড়লেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এনবিএফআইগুলো মোট ৭৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় ১ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ, ঋণের প্রবৃদ্ধি আমানতের প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে।
উদ্বেগজনকভাবে, খেলাপি ঋণও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৫২ শতাংশ। মাত্র নয় মাস আগে, ডিসেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা বা ২৯.২৭ শতাংশ। অর্থাৎ, নয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা বা ২১.৩১ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে ৩৫টি এনবিএফআই চালু রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি সরকারি এবং বাকিগুলো দেশি-বিদেশি ও বেসরকারি মালিকানাধীন। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে। এক ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এতটাই নাজুক যে তাদের ৬০ শতাংশেরও বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
আমানতের ভৌগোলিক বণ্টনে দেখা যায়, প্রায় ৯২.৫৩ শতাংশ আমানতই ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (৪.৬২%), রাজশাহী (০.৯৬%) এবং খুলনা (০.৭৯%)।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক সময়ে আমানতকারী ও আমানতের বৃদ্ধি এনবিএফআই খাতের জন্য আশার আলো দেখালেও, আকাশছোঁয়া খেলাপি ঋণ এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট কাটিয়ে খাতটির টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।