চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, যেখানে সবুজের গালিচা বিছানো ১৮টি চা-বাগান দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদন কেন্দ্র, আজ বিবর্ণ, রুক্ষ। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির অভিশাপে এখানকার চা-গাছগুলো যেন নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। গত অক্টোবরে শেষবার ছিটেফোঁটা বৃষ্টির দেখা মিলেছিল, তারপর থেকে আকাশ যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মাস পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টির দেখা নেই, আর তার করুণ প্রভাব পড়ছে এই অঞ্চলের চা-শিল্পের ওপর।
মাটি ফেটে চৌচির, শুকিয়ে গেছে ছড়া-খালের জলধারা। সেচের ব্যবস্থা নেই অধিকাংশ বাগানেই। তীব্র রোদে ঝলসে যাচ্ছে কচি চা-পাতা, শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে গাছের ডালপালা। মাটির ন্যূনতম আর্দ্রতাটুকুও শুষে নিচ্ছে দিনের প্রখর উত্তাপ আর রাতের হিম। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী চারাগাছগুলো এই নিষ্ঠুর প্রকৃতিকে সহ্য করতে না পেরে নেতিয়ে পড়ছে, মরে যাচ্ছে। অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চারাগাছ ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত, নার্সারিতে এই হার ৩০ শতাংশ। পরিণত গাছগুলোও রেহাই পাচ্ছে না, প্রায় ১০ শতাংশ মৃত্যুর মুখে।
যে গাছগুলো ছাঁটাই করা হয়েছিল, সেগুলোর কাটা ডাল শুকিয়ে উঠছে, সেখানে ছত্রাকের বাসা বাঁধার আশঙ্কা। বৃষ্টির অভাবে নতুন কুঁড়ি গজাতে পারছে না, ফলে পাতা তোলার সময় পিছিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বাগান ব্যবস্থাপকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ – আর এক সপ্তাহ বৃষ্টি না হলে লাল মাকড়সার আক্রমণ মহামারী আকার ধারণ করতে পারে।
এই হাহাকার শুধু চা-গাছের নয়, চা-শ্রমিকদেরও। নেপচুন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিনের কণ্ঠে অসহায়ত্ব, “পানি একদম শুকিয়ে গেছে। শ্রমিকদের খাওয়ার পানিটুকুও নেই। নোংরা কাদা পানি ব্যবহার করে তারা খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।”
রাঙ্গাপানি বাগানের ব্যবস্থাপক উৎপল বিশ্বাস আশঙ্কা করছেন, দ্রুত বৃষ্টি না হলে ব্যাপকহারে গাছ মরা শুরু হবে, পাতা তোলাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, অন্তত দুই মাস পিছিয়ে যাবে পুরো প্রক্রিয়া। উদালিয়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো. নাদিম খানের কথায় প্রকৃতির প্রতি আকুতি, “প্রকৃতির দয়া ছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই। পানির সব উৎস শুকিয়ে গেছে।”
এককালে যে ছায়াবৃক্ষগুলো এই চা-গাছগুলোকে আগলে রাখত, অবাধে কাটার ফলে আজ সেগুলোও উধাও অনেক বাগানে। ফলে খরার সময় সরাসরি রোদের তীব্রতা সহ্য করতে হচ্ছে গাছগুলোকে, যা কেবল গাছের ক্ষতিই করছে না, চায়ের গুণগত মানও নষ্ট করছে।
গত বছর যেখানে ১ কোটি ১২ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল, সেখানে এই বছর উৎপাদন অন্তত ১০ লাখ কেজি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশীয় চা-সংসদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক চেয়ারম্যান ও চৌধুরী টি-স্টেটের ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, যাদের নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা আছে, তারা কিছুটা রক্ষা পেলেও অধিকাংশ বাগানই প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার শিকার।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, আগামী এক সপ্তাহেও পরিস্থিতির উন্নতির তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলো আজ তাই বৃষ্টির জন্য আকুল হয়ে আছে। মাটি, গাছ, মানুষ – সবাই যেন আকাশের দিকে চেয়ে আছে এক ফোঁটা স্বস্তির আশায়। প্রকৃতির করুণা ছাড়া এই ভয়াবহ ক্ষতি এড়ানোর আর কোনো পথ খোলা নেই।