দেশের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মিয়ানমারের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে এ শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্যমতে, নগরের ৩ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন এই ঝুঁকির আওতায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর চট্টগ্রামের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড ও ইমারত বিধিমালা অনুসরণ না করা, অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস উভয়েই মনে করেন, মিয়ানমারের মতো ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামের ৭০ শতাংশ ভবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমের মতে, বেশিরভাগ ভবনই ইমারত বিধিমালা বা জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হয়নি এবং এগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেই। তিনি ভবন নির্মাণকালে সিডিএর তদারকির ঘাটতির দিকেও ইঙ্গিত করেন।
এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) অধীনে পরিচালিত এক জরিপেও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছিল। তখন নগরের ১ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে ৯২ শতাংশ বা ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৫০টি ভবনকেই ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি।
সিডিএর কর্মকর্তারা লোকবল সংকটের কারণে ভবন নির্মাণ তদারকিতে ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস দাবি করেন, বর্তমানে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। ১০ তলার নিচের ভবনগুলো সিডিএ নিজে এবং ১০ তলার উপরের ভবনগুলো বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞরা শুধু ভবনগুলোর দুর্বল কাঠামো নিয়েই চিন্তিত নন, ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতির অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এককথায় ভূমিকম্প–পরবর্তী অবস্থা মোকাবিলা করতে আমরা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত।” ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন বা সিডিএ – কারও বিশেষ প্রস্তুতি নেই। উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অপ্রতুল। এছাড়া, নগরের বহু ভবন ঘিঞ্জি এলাকায় এবং সরু গলিতে নির্মিত হওয়ায় ভূমিকম্পের পর সেখানে উদ্ধারকারী যান বা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোও কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনও मानते हैं যে, বেশিরভাগ ভবন নিয়ম না মেনে তৈরি হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিএর তদারকিতে ঘাটতি ছিল। তিনি আরও বলেন, এমন অনেক জায়গায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যেখানে উদ্ধার তৎপরতা চালানো অত্যন্ত কঠিন হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প–বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন আখতার বলেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, জনগণকে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করা এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন করার ওপর তিনি জোর দেন। অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর শক্তি বৃদ্ধি (রেট্রোফিটিং) করার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অতীতেও চট্টগ্রাম ভূমিকম্পে ক্ষতির শিকার হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বরের ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে একটি পাঁচতলা ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল ৬.৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরের ১২টি ভবন হেলে পড়েছিল। বড় ধরনের ভূমিকম্পের আগেই চট্টগ্রামের ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।