চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রাণচঞ্চল হালদা নদী এখন প্রায় পানিশূন্য। নদীর বিস্তীর্ণ অংশ শুকিয়ে পরিণত হয়েছে বালুকাময় প্রান্তরে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সেচ সংকট, যা হাজার হাজার কৃষকের জীবন ও জীবিকার উপর চরম আঘাত হেনেছে। ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধান ও সবজি চাষাবাদ, অনুর্বর হয়ে পড়ছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি।
পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে হালদা নদী ফটিকছড়ির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বিপুল পরিমাণ বালিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নদীর গভীরতা যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে এর পানি ধারণ ক্ষমতা। শুষ্ক মৌসুমে এই অগভীর নদী শুকিয়ে প্রায় মৃত অবস্থায় উপনীত হয়, যা গত এক দশক ধরে ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছে।
ফটিকছড়ি উপজেলার সমিতিরহাট, রোসাংগিরি, দৌলতপুর, সুয়াবিল, ধুরুং, সুন্দরপুর, ভুজপুর, হারুয়ালছড়ি, পাইন্দং এবং নারায়ণহাটসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক পরিবার যুগ যুগ ধরে হালদার পানি ব্যবহার করে নদীর চরে এবং তীরবর্তী জমিতে বোরো ধান ও বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষ করে আসছে। এই চাষাবাদই তাদের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন।
সুন্দরপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক মোঃ শুক্কুর স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এক দশক আগেও নদীতে অনেক গভীরতা ছিল, প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। আমরা নদীর পানি দিয়েই সবজি ও ধান চাষ করতাম। চরের ফসল ফলিয়েই বহু কৃষক স্বাবলম্বী হয়েছে।”
কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুয়াবিল গ্রামের চাষী সাধন বিপ্লব হতাশ হয়ে জানান, “হালদার চরে আমার ৫০ শতক জমি আছে, যেখানে শুধু সবজি চাষ করতাম। নদীর পানিই ছিল জমির উর্বরতার মূল উৎস। কিন্তু এখন পানি না থাকায় চরের জমি চাষ করতে পারছি না, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

সরেজমিনে উপজেলার সমিতিরহাট থেকে নারায়ণহাট পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীজুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় বালুর চর। ক্ষীণ জলধারা যা অবশিষ্ট আছে, তা বালির নিচু অংশ দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের বালতি দিয়ে সেই সামান্য পানি তুলে কষ্টেসৃষ্টে জমিতে সেচ দিতে দেখা গেছে। পাইন্দং গ্রামের সবজি চাষি আলমগীর হোসেন জানান, শুধু তার এলাকাতেই চার শতাধিক কৃষক বোরো ও অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, কিন্তু পানির অভাবে তারা এখন অসহায়। অভাব অনটন জেঁকে বসেছে কৃষক পরিবারগুলোতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উল্লেখিত ইউনিয়নগুলোর প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি হালদা নদীর সেচের উপর নির্ভরশীল। গত এক দশকে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকার ফসলি জমি অনেকটাই অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছে।”
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু কৃষিকেই সংকটে ফেলেনি, এর পরিবেশগত প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় শাখা খালগুলোও মরে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য হুমকিস্বরূপ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সমস্যার গভীরতা স্বীকার করে বলেন, “হালদার পানির ওপর শুধু সবজি বা চরের ফসল নয়, কয়েকটি বড় বিলের বোরো ধান চাষও নির্ভরশীল। নদী ভরাট হওয়ায় এর শাখা খালগুলোও অস্তিত্ব সংকটে। আমরা নদী ও খালগুলো খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করব।”
হালদা নদীর এই করুণ দশা ফটিকছড়ির কৃষি অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত। হাজার হাজার কৃষকের হাহাকার আর অনুর্বর জমির আর্তনাদ দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে নদী খনন ও পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।