সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বৈসাবি উৎসব সামনে রেখে পাহাড়ে কোমর তাঁতের ব্যস্ততা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাহাড়ের পাড়াগুলো এখন মুখরিত এক বিশেষ ছন্দে – কোমর তাঁতের খটখট শব্দ। সামনেই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, চাংক্রান, যা সম্মিলিতভাবে ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। বর্ষবরণ ও বিদায়ের এই বর্ণাঢ্য উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি নারীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরিতে।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রীতি অনুযায়ী, পাহাড়ি নারীরা কোমর তাঁতে বুনে চলেছেন তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচায়ক পোশাক। চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে যা ‘পিনন-হাদি’ এবং ত্রিপুরাদের কাছে ‘রিনাই-রিসা’ নামে পরিচিত। যদিও সারা বছর বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরার চল রয়েছে, তবে বৈসাবি উৎসবের সময় এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কদর থাকে সবার উপরে।

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার চম্পাঘাট এলাকায় সম্প্রতি দেখা যায় কনিকা ত্রিপুরাকে (৪২) একটি তাঁতে দুটি ‘রিনাই’ বুনতে। তিনি জানান, নিজের এবং এক প্রতিবেশীর মেয়ের জন্য এই পোশাক তৈরি করছেন তিনি। পছন্দের নকশা ফুটিয়ে তুলতে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দিনরাত এক করে কাজ করছেন, যাতে উৎসবের আগেই তা শেষ করা যায়।

অন্যদিকে, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুজা চাকমা (১৮) কোমর তাঁতে ‘পিনন-হাদি’ বুনছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু করা এই কাজ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজের পড়াশোনা ও হাতখরচ চালানোর পাশাপাশি মায়ের হাতেও কিছু টাকা তুলে দিতে পারেন বলে জানান তিনি।

একইভাবে, পানছড়ির ভাইবোনছড়া এলাকার রেনুকা চাকমাও (২৮) ব্যস্ত সময় পার করছেন ফরমায়েশি ‘পিনন-হাদি’ তৈরিতে। তিনি বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে পিনন-হাদি বুনলেও অন্য সময় তেমন দাম পাই না। কিন্তু এই উৎসবের সময় চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, দামও ভালো পাওয়া যায়। অনেকে আগে থেকেই পছন্দের নকশা দিয়ে যান, সেই অনুযায়ী তৈরি করে দিতে হয়। লাভের আশায় দিনরাত খাটছি।”

তাঁতশিল্পীরা আরও জানান, একটা সময় ছিল যখন হাতে গোনা কয়েকটি রঙের সুতা দিয়েই এই পোশাক বোনা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে এবং নিজেদের সৃজনশীলতার প্রয়োগে বিভিন্ন রঙের সুতা ও আকর্ষণীয় নকশার ব্যবহার বেড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে কোমর তাঁতে এই পোশাক বোনার ব্যস্ততা কেবল একটি ঐতিহ্যকেই টিকিয়ে রাখেনি, বরং এটি বহু পাহাড়ি নারীর খণ্ডকালীন আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে। উৎসবের আনন্দ আর ঐতিহ্যের বুননে জড়িয়ে আছে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রয়াসও। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর অর্থনীতির এই মেলবন্ধনেই যেন পূর্ণতা পায় পাহাড়ের বর্ষবরণ উৎসব।

পাঠকপ্রিয়