চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী এবং তার নেতৃত্বাধীন বিগত পরিষদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তপূর্বক একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। গত বছরের ৩ নভেম্বর শপথ গ্রহণের পর তিনি এই অঙ্গীকার করেন। তবে, আদালতের নির্দেশে ১৫ মাসের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান মেয়রের প্রশাসন এখনো সেই প্রতিশ্রুত শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারেনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ডা. শাহাদাত হোসেন পরিচ্ছন্নতা, আলোকায়ন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মতো নাগরিক সেবা উন্নয়নের পাশাপাশি পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়কার অনিয়মের চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার কথা বলেছিলেন। খাল-নালা পরিষ্কার, কর্পোরেশনের দোকান ও জমি বরাদ্দ এবং উন্নয়ন কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত করে বিস্তারিত জানানোর পরিকল্পনা ছিল।
মেয়র ডা. শাহাদাত উল্লেখ করেছিলেন, তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কিছু চিত্র পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে, তিনি শুলকবহর ওয়ার্ডের বিপ্লবী উদ্যানে ২৫টি দোকান বরাদ্দে অনিয়মের মাধ্যমে ১০-১২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন এবং এর জন্য সাবেক মেয়র ও কাউন্সিলররা দায়ী বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এই অনিয়মগুলোর তথ্য জনগণের জানা উচিত এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
শ্বেতপত্র প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে, সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলাও দায়ের হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালতে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম সাইফুদ্দিন সৈয়দ এই মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, তার মেয়ে সাবিহা তাসনিম তানিম, ভাই নুরুল করিম চৌধুরীসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেছেন, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট আসামিরা তাকে গাড়িতে তুলে চান্দগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করে লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে ৬.৮ শতাংশ জমির সাফ কবলা দলিলে জোরপূর্বক সই করিয়ে নেয়।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হন এবং সকল ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদেও মূলত আওয়ামী লীগ-সমর্থিতরাই নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক মেয়রসহ বেশিরভাগ কাউন্সিলর আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা দায়ের হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়াদকালে চসিকের কার্যক্রমে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে: বিজ্ঞপ্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অস্থায়ী ও দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে লোক নিয়োগ দেওয়া; প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ২৫টি কাজ গণখাতে ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণ না করে ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়া; বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নগরের বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের প্রদান করা (অন্তত চারটি ওয়ার্ডে এমন অভিযোগ উঠেছে); তুলনামূলক ছোট ও কম জনসংখ্যার ওয়ার্ড হওয়া সত্ত্বেও নিজের ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক বেশি অঙ্কের উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া; ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করা; এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া। এছাড়া, তার সময়ে গৃহকর বৃদ্ধির প্রতিবাদকারী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ওপর হামলা ও মামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আত্মগোপনে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে এম রেজাউল করিম চৌধুরীর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ-এর মতে, স্থানীয় সরকার কাঠামোয় মেয়রদের হাতে থাকা ব্যাপক ক্ষমতা এবং জবাবদিহিতার অভাব এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। তিনি মনে করেন, অনেক মেয়র সেবার চেয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও লোক নিয়োগে বেশি মনোযোগ দেন। অধ্যাপক আহমেদ চট্টগ্রামের সাবেক মেয়রের আমলের উত্থাপিত অনিয়মগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।