শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে, কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আশার সঞ্চার করে। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন আশিক চৌধুরী। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশের মানুষের সেবায় তিনি যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কর্মদক্ষতা, জ্ঞান, উপস্থাপনা শৈলী এবং সাবলীল বাচনভঙ্গি দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন সব স্তরের মানুষের মন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সর্বত্রই এখন তাকে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা। অনেকেই তাকে অভিহিত করছেন ‘আসল নায়ক’ হিসেবে।
সম্প্রতি আশিক চৌধুরীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়, তথ্য-উপাত্তসহ বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর চিত্র তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। অনেকেই তার ভিডিও শেয়ার করে ভূয়সী প্রশংসা করছেন। একইসাথে প্রশ্ন উঠছে— এতদিন কোথায় ছিলেন এই মেধাবী মানুষটি? কেন তাকে আগে দেশের কাজে লাগানো হয়নি?
আশিক চৌধুরী পেশায় একজন ব্যাংকার। তিনি সিঙ্গাপুরে বহুজাতিক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)-এর রিয়েল অ্যাসেট ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার জীবনযাত্রা ছিল যথেষ্ট বিলাসবহুল ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি ফোনকল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দেশের সেবার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি প্রায় সাথে সাথেই রাজি হয়ে যান। নিজের ভাষায়, স্ত্রীর সাথে পরামর্শ না করেই তিনি রাজি হয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন, দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ তার স্ত্রীও হাতছাড়া করতে দেবেন না। এভাবেই মাত্র ৫৯ সেকেন্ডের এক হোয়াটসঅ্যাপ কলে সিঙ্গাপুরের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে তিনি বিডার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, যা তার বন্ধুদের ভাষায় ‘বাংলাদেশের চিফ মার্কেটিং অফিসার’-এর ভূমিকা।
চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করলেও বাবার চাকরির সুবাদে আশিক চৌধুরীর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যশোরে। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্কুল ও কলেজের পাঠ সম্পন্ন করেন। এরপর ভর্তি হন দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। ২০০৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দেশের একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে, যেখানে তিনি নিজেকে আরও শাণিত করেন।
তবে আশিক চৌধুরী শুধু একজন সফল ব্যাংকার বা মেধাবী ছাত্রই নন, তিনি একজন দুঃসাহসী স্কাইডাইভারও। ৪১ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বুকে ধারণ করে স্কাইডাইভ করে তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বুকে নিজের নাম লিখিয়েছেন, যা তার অদম্য মানসিকতা ও দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির।
গত বছরের (২০২৪ সাল) ১২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আশিক চৌধুরীকে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদায় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, চলতি বছরের (২০২৫ সাল) ৭ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আশিক চৌধুরী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার লক্ষ্য বাংলাদেশে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যা দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে এবং প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অন্তত এক লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও রয়েছে তার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মঞ্জুর হোসেন অয়নের মতো অনেকেই তার কাজের প্রশংসা করে লিখছেন, “এই লোকটা ড. ইউনূসের থেকেও বড় খেলোয়াড়… স্টারলিংক নিয়ে এসেছে, নাসার সাথে চুক্তিতে চলে গিয়েছে… ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ… পাঁচটা মালবাহী জাহাজ… রিভার ম্যানেজমেন্ট… চারটা আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল… ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ইলেকট্রনিক ট্রেন… ১০টা বৃহত্তর ইকোনমিক জোন…”। তার অল্প কয়েক মাসের কার্যক্রমে এসব উদ্যোগের খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সমর্থন পেলে আশিক চৌধুরী এবং তার মতো নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরা দেশকে সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।
বিপুল প্রত্যাশার চাপ এবং কর্মব্যস্ততা নিয়ে আশিক চৌধুরী নিজেও অত্যন্ত সচেতন। গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অকপটে তার অনুভূতি শেয়ার করেছেন। জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মাসেই তিনি সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াই প্রতিদিন গড়ে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছেন। প্রায় আড়াই শ’ সিইও এবং ব্যবসায়ীর সাথে বৈঠক করে বিনিয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
জনগণের সরকারের প্রতি মানুষের উচ্চাশাকে তিনি জাতীয় ক্রিকেট দলের সাথে তুলনা করে বলেন, সবাই দলের জয় চায়, কিন্তু একটি খারাপ হলেই সমালোচনা শুরু হয়। তবে এই সমালোচনাকে তিনি বাকস্বাধীনতার অংশ হিসেবেই দেখছেন এবং ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ভুল হবে, কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।
আশিক চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের উত্থান প্রমাণ করে যে, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম এবং সঠিক সুযোগ পেলে দেশের জন্য অভূতপূর্ব সাফল্য বয়ে আনা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস, প্রশংসা এবং ‘আসল নায়ক’ তকমা এটাই প্রমাণ করে যে, জাতি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সোহেল রানার মতো অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “সরকারের খুব ভালো একটা রিক্রুটমেন্ট… বাংলাদেশের সবক্ষেত্রে এ রকম আরও অনেক আশিক দরকার।” যদি আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় এবং পরিকল্পিত উদ্যোগগুলো সফল হয়, তবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার হাত ধরেই হয়তো রচিত হবে এক নতুন বাংলাদেশের গল্প।