যে হাতগুলো ভিনদেশের মাটি কামড়ে ধরে, যে ঘাম লোনা হয়ে ঝরে পড়ে অচেনা কারখানার মেঝেতে কিংবা তপ্ত মরুর বুকে, সেই হাত, সেই ঘামই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে– এই সত্য প্রায়শই চাপা পড়ে যায় ডলারের অঙ্কের নিচে। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই অবদান রাখছেন, সেই প্রবাসী কর্মীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বা ‘অর্থনৈতিক নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, তাদের পথচলার বাস্তবতা কতটা কণ্টকাকীর্ণ, তা যেন আড়ালেই থেকে যায়। একদিকে তাদের পাঠানো অর্থে রিজার্ভ স্ফীত হয়, অন্যদিকে তাদের অনেকেই ভোগেন অবহেলা, বঞ্চনা আর শোষণের নিদারুণ কষ্ট। দালালদের প্রতারণা, নিয়োগকর্তার অমানবিকতা আর বিদেশের মাটিতে আইনি সুরক্ষার অভাব তাদের স্বপ্নগুলোকে প্রায়শই দুঃস্বপ্নে পরিণত করে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশের রোকেয়া (ছদ্মনাম) তার জীবনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি আশ্রয় নিলেও, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে চট্টগ্রাম শহরে এসে রান্নার কাজ নিতে হয়। সেখানেই পরিচয় হয় সেলিনা নামের এক মহিলার সাথে, যার স্বামী বিদেশে লোক পাঠান। রোকেয়া বলেন, “সেলিনা আমাকে বুঝিয়েছিল, তার স্বামী ভালো লোক, আমাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার কাজ দেবে। একটা বাড়িতে পাঁচ-ছয় জনের রান্না আর দুটো বাচ্চার দেখাশোনা। ভালো বেতন, থাকা-খাওয়া সব ফ্রি। সন্তানদের একটা ভালো ভবিষ্যতের আশায় আমি রাজি হয়ে যাই।” এই স্বপ্নের জন্য তাকে জোগাড় করতে হয় দুই লক্ষ টাকা। তিনি জানান, “বিয়ের দেনমোহরের টাকা আর জমানো কিছু টাকা দিয়েও কুলাচ্ছিল না, তাই ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয়েছিল।”
কিন্তু দুবাই পৌঁছানোর পর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। তাকে পাঠানো হয় শহর থেকে দূরে এক রিসোর্টের মতো বাগানবাড়িতে। রোকেয়া স্মৃতিচারণ করেন, “সেখানে প্রতি সপ্তাহে মালিকের ছেলেরা তাদের ১০-১৫ জন বন্ধু নিয়ে ফুর্তি করতে আসত। আমাকে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের সবার জন্য রান্না করতে হতো, মদ এগিয়ে দিতে হতো, নোংরা পরিষ্কার করতে হতো। একটু ভুল হলেই জুটত মারধর।” তিনি আরও যোগ করেন, “শুধু মারধর নয়, ওরা গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করত, খারাপ ইঙ্গিত করত। দুইবার এমন হলে আমি মালিককে বলি। কিন্তু মালিকের স্ত্রী উল্টো আমাকেই শাসায়, বলে তার ছেলেরা যা বলবে তাই করতে।”
এক রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে, “সেদিন প্রায় ২২ জন এসেছিল। আমি ক্লান্তিতে পারছিলাম না। মদ এগিয়ে দিতে দেরি হওয়ায় মালিকের এক ছেলে আমাকে পাগলের মতো মারতে শুরু করে, কামড়ে দেয় শরীরে।”
সেই রাতে পালিয়ে পুলিশের আশ্রয় নেন তিনি। যার মাধ্যমে এসেছিলেন, সেই রোকেয়ার স্বামীর ফোন তখন বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। অশ্রুসজল চোখে রোকেয়া বলেন, “শুনেছিলাম বিদেশ গেলে মানুষ ভালো থাকে। আমিও তো সন্তানদের জন্যই গেছিলাম। আসলে আমার ভুল ছিল দালালের মাধ্যমে যাওয়া। ওরা মানুষকে মানুষ মনে করে না।” তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে কেবলই হতাশা আর স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা। রোকেয়ার মতো ভাগ্যবতী সকলে নন; অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফেরেন।
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের নাজিমের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও, বঞ্চনার চিত্রটি একইরকম। ভাঙন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ সম্বল চিংড়িঘেরটি বন্ধক রাখতে বাধ্য হন তিনি। নাজিম বলেন, “সংসারের হাল ধরতে আর ঘেরটা ছাড়িয়ে আনতে ২০১৯ সালে পাঁচ লক্ষ টাকা ঋণ করে ব্রুনেই গিয়েছিলাম।” কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কোনো বেতনভুক্ত কাজ পাননি। তার ভাষায়, “এক বাংলাদেশি ঠিকাদারের বাড়িতে গৃহস্থালির সব কাজ করতাম – বাজার, রান্না, ঘর মোছা, কাপড় কাচা – শুধু থাকা আর খাওয়ার বিনিময়ে। কোনো বেতন দিত না। নয় মাস পর আবার ধার করে টিকিট কিনে খালি হাতে দেশে ফিরি।”
দেশে ফিরেও নিস্তার নেই। নাজিম জানান, “সব হারিয়ে বিদেশে গিয়ে আরও সর্বস্বান্ত হয়েছি। সেই পাঁচ লাখ টাকার ঋণ আজও শোধ করতে পারিনি, ঘেরটাও ছাড়াতে পারিনি। এলাকায় কোনো কাজ নেই। একেক সময় একেক কাজ করে কোনোমতে চলছি।” জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু হওয়া উপকূলের বহু মানুষেরই যেন প্রতিচ্ছবি নাজিম, যারা একটু সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে আরও নিঃস্ব হয়ে ফেরেন।
রোকেয়া বা নাজিমের মতো ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এগুলো এক বৃহত্তর সমস্যারই প্রতিফলন। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (আইআইইডি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মানুষজন ঋণ করে বিদেশে যাচ্ছেন এবং সেখানে আধুনিক দাসত্বের শিকার হচ্ছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া ৯৯ শতাংশ শ্রমিকই দাসত্বের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে এমন অন্তত একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং ৮১ শতাংশ পাঁচটিরও বেশি ধরনের শোষণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। যেমন, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার একজন কর্মীর বিদেশে যেতে গড়ে খরচ হয়েছে ৪ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা, যার একটি বড় অংশ (২৫%) এসেছে জমি বিক্রি করে এবং আরেকটি অংশ (১৮%) এসেছে চড়া সুদের ঋণে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর গবেষণা সমস্যাটির আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। রামরুর তথ্যমতে, ১৯ শতাংশ অভিবাসী প্রত্যাশী সম্পূর্ণ বা আংশিক খরচ দেওয়ার পরেও বিদেশে যেতে পারেননি প্রতারণার শিকার হয়ে। আরও জানা যায়, যারা যেতে পেরেছেন, তাদের ৩১ ভাগ বিদেশে যাওয়ার পর কাজ বা বেতন না পাওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়াসহ নানা রকম হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। রামরুর আরেকটি গবেষণা (‘ডেথ অব ফিমেল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স ইন ডেস্টিনেশন কান্ট্রিজ’) অনুযায়ী, বিদেশে মৃত্যুবরণকারী নারী কর্মীদের ৭৯ শতাংশই গৃহকর্মী এবং মৃত্যু সনদে যা-ই লেখা থাকুক, ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বজনরা সেই কারণ বিশ্বাস করেন না। সংশ্লিষ্ট দেশে পুলিশি তদন্তের অভাবে পরিবারের আপত্তি থাকলেও কিছু করার থাকে না।
শুধু শোষণ বা প্রতারণাই নয়, প্রবাসীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও অত্যন্ত প্রকট। ওকাপের আরেকটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা যায়, দেশে ফিরে আসা স্বাস্থ্যসেবাপ্রার্থী কর্মীদের ৪৮ শতাংশই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ মানসিক সমস্যায় ভোগা পুরুষ কর্মীর হার (৫৩%) নারীদের (৩৭%) চেয়ে বেশি, যা প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং পুরুষ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। পিঠে ব্যথা, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সারের মতো শারীরিক সমস্যা তো রয়েছেই। কিছু কর্মী বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে বা কাজ না পেয়ে অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরে চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা এই চিকিৎসা ব্যয়কে ‘গোপন অভিবাসন খরচ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা অভিবাসনের মোট ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয় কিন্তু প্রায়শই তা হিসেবের বাইরে থেকে যায়। সৌদি আরব থেকে ফেরা কেউ কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, কারণ বাঁচার আর কোনো পথ খুঁজে পান না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামালউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, চরম নিপীড়ন বা বিরূপ পরিস্থিতি মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
বিপরীতে, এই মানুষগুলোই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ বাংলাদেশি কর্মী প্রতিবছর গড়ে ২৩-২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই এসেছে ২৫৪ কোটি ডলারের বেশি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বীকার করেছেন, ‘বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত।’ প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের রিজার্ভ বাড়ানো ও দেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে দ্বিগুণ হয়ে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোভিড মহামারি বা সাম্প্রতিক ডলার সংকটের সময় তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করেছে।
এত বড় অবদান সত্ত্বেও তাদের বঞ্চনার তালিকা দীর্ঘ। সরকারি হিসাব মতেই, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রবাসে ১৯ হাজার ৩৮৭ জন কর্মীর লাশ হয়ে ফিরে আসা এক মর্মান্তিক বাস্তবতা। এর মধ্যে নারী কর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭২৫ জন নারী প্রবাস থেকে লাশ হয়ে ফিরেছেন। এদের মধ্যে ‘স্বাভাবিক’ মৃত্যু ২৭২ জন, ‘স্ট্রোক’ ১৩৮ জন, ‘আত্মহত্যা’ ১১৬ জন, ‘দুর্ঘটনা’ ১০৯ জন এবং ‘হত্যা’ ১৬ জনের। বিমানবন্দরে রোজ ৮-১০টি লাশ আসে, যার মধ্যে নারী লাশও থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, বেশিরভাগ নারী কর্মীর লাশ আসে সৌদি আরব থেকে, এছাড়া জর্ডান, ওমান, লেবানন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আসে।
বিএমইটির তথ্যমতে, ১৯৯১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ নারী কর্মী বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে সাড়ে চার লাখই সৌদি আরবে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা যখন নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের কারণে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়, তখন বাংলাদেশ নারী কর্মী পাঠাতে রাজি হয় (২০১৫ সালের চুক্তি) পুরুষ কর্মীদের বাজার খোলার শর্তে। এরপর থেকে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী সৌদি গেছেন (২০১৫-২০২২ পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি), কিন্তু অনেকেই সেখানে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, চুল টেনে তোলা, মারধর, গরম ইস্ত্রি দিয়ে শরীর পুড়িয়ে দেওয়া, এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অনেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বা হাত-পা ভাঙা অবস্থায় দেশে ফিরেছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এক কোটির বেশি প্রবাসী নাগরিকের ভোটাধিকার না থাকাটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। দূতাবাসগুলোর সেবা নিয়ে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। যেমন, মিশরের দূতাবাসে আরবি জন্মনিবন্ধন বা ডকুমেন্ট গ্রহণে অস্বীকৃতি এবং শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহারের মতো অভিযোগ উঠেছে, যা বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের অসহায়ত্বকেই প্রকাশ করে। বিমানবন্দরে হয়রানি, লাগেজ হারানো, ট্রলির অভাব, দীর্ঘ লাইন আর চেকিং যেন শ্রমজীবী প্রবাসীদের জন্য এক নিয়মিত বিড়ম্বনা। প্রবাসী কর্মীরা অসুস্থ বা খালি হাতে দেশে ফিরে শুধু চিকিৎসার খরচ জোগাতেই হিমশিম খান না, মুখোমুখি হন সামাজিক হেনস্থারও। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান যেমনটা বলেছেন, ‘ফেরত আসা শ্রমিকরা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে সহযোগিতা পান না। তারা পরিবারের কাছে টাকার মেশিনের মতো, রাষ্ট্রের কাছে রিজার্ভ।’
এই ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও বঞ্চনার কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনীম সিদ্দিকী মনে করেন, এর মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা। তিনি উল্লেখ করেন, “অভিবাসন খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। আমরা দীর্ঘদিন ধরে মোট রাজস্ব বাজেটের ১% অথবা মোট রেমিট্যান্স আয়ের ৫% বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছি, যা পূরণ হয়নি।” তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুর ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ ফিরিয়ে আনা বা আইনি সহায়তা রাজস্ব বাজেট থেকে দিতে হবে।’
তার মতে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষায়িত ক্যাডার সার্ভিস না থাকায় দক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং বিএমইটি, ডেমো, টিটিসি, বোয়েসেল, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে (যেমন কম খরচে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু) যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী যদিও বাণিজ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ১০৪ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে আরও ৫০টি কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগের কথা বলেছেন, তাসনীম সিদ্দিকী মনে করেন, এই টিটিসিগুলোকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় আনা উচিত, কারণ সরকার একা এত সুবিধা দিতে পারবে না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার এবং তার সহকর্মীরা তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের সিন্ডিকেটের ২৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এই সিন্ডিকেটগুলো ভাঙা অপরিহার্য। তাদের মতে, সৌদি আরবে কর্মী নিয়োগে দূতাবাসের সত্যায়ন প্রক্রিয়া জটিল করার কারণেও কর্মী প্রেরণ ব্যাহত হচ্ছে এবং এতে অসাধু চক্র সুবিধা পাচ্ছে।
অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী এই সমস্যার সমাধানে ব্যক্তিগতভাবে সংগৃহীত ভিসা এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণের নিয়ম বন্ধ করে জেলা পর্যায়ের ডেমো অফিসগুলোকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেছেন, যাতে কর্মীরা সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে যেতে পারেন। অন্যদিকে, জালাল উদ্দিন শিকদার এজেন্সিগুলোর জন্য পারফরম্যান্স-ভিত্তিক র্যাঙ্কিং সিস্টেম চালু, দালালদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং বায়রাকে সংস্কার করে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার উপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা একমত যে, শুধু অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স ধরে রাখার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যেমনটি পাকিস্তান বা ফিলিপাইন করছে।
তবে, প্রবাসী শ্রমিকদের সহায়তার জন্য আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তেমন কোনো সুসংবাদ নেই, যা রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা আশা করেছিলেন, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়ানো হবে (কমপক্ষে ৫ শতাংশে উন্নীত হবে) এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা কমাতে নতুন প্রকল্প বা কর্মসূচি নেওয়া হবে, কিন্তু তা হয়নি। বৈধ পথে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ শতাংশ প্রণোদনা শুরু হয়েছিল, যা পরে আড়াই শতাংশ করা হয়। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের স্বীকৃতি বাজেটে থাকলেও, তাদের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শরিফুল হাসান উল্লেখ করেন, ‘প্রবাসী শ্রমিক মারা গেলে পরিবার যে তিন লাখ টাকা পায়, তা সরকারি কোষাগার থেকে আসে না, বরং দেশ ছাড়ার সময় শ্রমিকের দেওয়া কল্যাণ ফি থেকেই দেওয়া হয়।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রবাসী শ্রমিকরা এত ডলার দেশে নিয়ে আসেন, অথচ তাদের কল্যাণে পর্যাপ্ত কোনো ব্যবস্থা নেই।’ ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হকও একমত যে, ‘শ্রমিকদের কল্যাণে নিজেদেরকেই টাকা দিতে হয়। এমন পরিস্থিতি থেকে সরকারের সরে আসা উচিত।’ তিনি শ্রমিকদের কল্যাণে রাজস্ব বাজেট থেকে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান, কারণ সরকারি টাকা খরচ হলে কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বাড়বে।
সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা আশার সঞ্চার করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, “বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য ভিআইপি সমমানের সেবা নিশ্চিত করা, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের জটিলতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পুনর্বাসন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি ঋণের কিস্তি পরিশোধের ব্যবস্থা চালু, ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের সীমা প্রত্যাহার, দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে আনা, কর্মী প্রেরণে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ অনুমতি পদ্ধতি বাতিল করে প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দালাল নিবন্ধন ও এজেন্সিগুলোর ক্যাটাগরি করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, সৌদি আরবের সাথে কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীর ভাষায়, “এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুধু একজন উপদেষ্টার পক্ষে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশীদারত্ব।” প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, নারী কর্মীদের নিরাপত্তা বিধান (বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো দেশে, যেখানে নির্যাতনের হার বেশি), বিদেশে সেফ হোম প্রতিষ্ঠা, কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু, ফেরত আসা কর্মীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার মতো দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও, শরিফুল হাসান দেশের প্রতিটি দূতাবাসে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ওয়েলফেয়ার সেন্টার করার দাবি জানিয়েছেন।
জনশক্তি প্রেরণকারী ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার সদ্য সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিদেশে নারী নিপীড়ন বা মৃত্যুর ঘটনায় শুধু এজেন্সি নয়, বিদেশের নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিদেশে নারী নিপীড়ন বা শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে দূতাবাসগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশকে তদন্ত করতে বলা উচিত। এই বিষয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশনও দায়ের করা হয়েছে, যাতে প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণ তদন্ত, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উচিত গণ-আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। এটি তাদের মনোবল বাড়াবে এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করবে।”
শরিফুল হাসানের ভাষায়, “বিদেশে একজন বাংলাদেশি নারীর কান্না মানে পুরো দেশের কান্না। একজন নারীর নিপীড়ন মানে দেশের নিপীড়ন।” এই সত্য উপলব্ধি করে সরকারসহ সকল মহলের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে সোনার হরিণ ধরতে যাওয়া মানুষগুলোর দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন : প্রবাসীদের সুরক্ষায় করণীয় কী?