সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

হারানো খেলা ফিরছে পাহাড়ের উৎসবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুতে পাহাড়ের কোল জুড়ে নামে উৎসবের রঙ। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের এই আনন্দযজ্ঞ শুধু নতুন বছরকে স্বাগত জানানোই নয়, এ যেন শেকড়ের সন্ধান। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু, বিহু বা চাংক্রানকে ঘিরে মেতে ওঠেন নানা আয়োজনে। আর এই উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ঐতিহ্যবাহী নানা খেলাধুলা, যা ফিরিয়ে আনে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি, লোককথার চরিত্র আর পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতিকে।

একসময় পাহাড়ের জীবন ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল ‘ঘিলা’ নামের এক শিমজাতীয় বীজ। বনে জঙ্গলে বেড়ে ওঠা ঘিলালতা থেকে এই বীজ সংগ্রহ করা হতো। চাকমা লোকসাহিত্যের অমর প্রেমগাথা ‘রাধামন-ধনপুদি’-তে উল্লেখ আছে, ধনপুদির আবদারে দূর অরণ্য থেকে রাধামন ঘিলা সংগ্রহ করে আনেন এবং পরে সেই ঘিলা নিয়ে খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

কবি ও লেখক মৃত্তিকা চাকমার মতে, ঘিলা সংগ্রহ ও খেলা নিয়ে এই পালায় বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, যা পাহাড়ের মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব তুলে ধরে। যদিও সময়ের সাথে সাথে ঘিলা খেলার সেই জৌলুস এখন আর আগের মতো নেই, তবে বর্ষবরণের উৎসবকে কেন্দ্র করে এই খেলার আয়োজন করে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস দেখা যায়।

ঘিলা খেলা কমলেও হারিয়ে যায়নি পাহাড়ের খেলার ঐতিহ্য। বর্ষবরণের এই সময়ে প্রতিটি পাড়া-মহল্লা মুখরিত হয়ে ওঠে ‘নাদেং’, ‘পত্তি’, ‘ফোর’, ‘গুডু’, ‘বলি খেলা’ আর ‘বাঁশ খড়ম দৌড়’-এর মতো সব লোকজ খেলায়। চাকমা ঐতিহ্যের অংশ ‘নাদেং’ হলো লাটিম খেলা। সমতলের বউচির পাহাড়ি সংস্করণ হলো ‘পত্তি’। দাড়িয়াবান্দা খেলাটি এখানে পরিচিত ‘ফোর’ নামে, আর হাডুডু বা কাবাডিকে ডাকা হয় ‘গুডু’ নামে। এছাড়াও অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে আয়োজন করা হয় বলি খেলা বা কুস্তি। বিশেষ আকর্ষণ থাকে ‘বাঁশ খড়ম দৌড়’ বা রণপা দৌড়, যেখানে প্রতিযোগীরা লম্বা বাঁশের উপর দাঁড়িয়ে দৌড়ে অংশ নেন। এই খেলাধুলা কেবল বিনোদনই নয়, এগুলো বহন করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনবোধ।

প্রতি বছর এপ্রিলের শুরু থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎসবের আমেজ শুরু হয়। রাঙামাটিতে এ বছরও (বা প্রতি বছর) জেলা পরিষদ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মতো সংস্থার উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব, সংস্থা ও পাড়াভিত্তিক উদ্যোগে গ্রাম ও শহরের নানা প্রান্তে চলে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। উৎসবকে ঘিরে চারপাশ মাতিয়ে রাখে বাঁশের তৈরি নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর – খেংগরং, বাঁশি, ধুধুক আর শিঙার আওয়াজ বাতাসে উৎসবের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

সাধারণত এপ্রিলের ১২, ১৩ ও ১৪ তারিখে মূল উৎসব পালিত হয়। যেমন চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে এই তিন দিন যথাক্রমে ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা নামে পরিচিত, যেখানে প্রতিটি দিনের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান। রাঙামাটির বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই ও চাংক্রান উদ্‌যাপন কমিটির সদস্যসচিব ইন্টু মনি তালুকদার জানান, উৎসবের অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট দিন রাখা হয়। তিনি বলেন, “আমরা ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো যেমন নাদেং, পত্তি, ফোর, বাঁশ খড়ম, গুডু সব খেলাই আয়োজন করি এবং বলি খেলার জন্যও বিশেষ দিন ধার্য থাকে।”

বর্ষবরণের এই উৎসব তাই শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো নয়, এ হলো পাহাড়ের মানুষের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক বর্ণাঢ্য প্রয়াস। ঘিলা থেকে গুডু, নাদেং থেকে বলি খেলা – প্রতিটি খেলাই যেন একেকটি জীবন্ত ইতিহাস, যা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যের সাথে বেঁধে রাখে দৃঢ় বন্ধনে।

পাঠকপ্রিয়