সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

যেভাবে ফোনে বিয়ে আর চাকরির লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের সাগরে ঠেলে দেয় দালালেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

উন্নত জীবনের প্রলোভন এবং বিয়ের আশ্বাস দিয়ে মালয়েশিয়া পাচারের সময় ২১৪ জন যাত্রীসহ একটি মাছ ধরার ট্রলার বঙ্গোপসাগর থেকে আটক করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। আটককৃতদের মধ্যে বেশিরভাগই কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা শরণার্থী, তবে একজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। এই ঘটনা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মানব পাচারের চলমান সংকট এবং আশ্রয়শিবিরের মানুষের হতাশা আবারও সামনে এনেছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার বিকেলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে ৪৪ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর জাহাজ ‘দুর্জয়’ এক অভিযান চালায়। এ সময় সন্দেহজনক ‘এফবি কুলসুমা’ নামের মাছ ধরার ট্রলারটিকে থামিয়ে তল্লাশি করা হলে ১১৮ জন পুরুষ, ৬৮ জন নারী ও ২৮টি শিশুসহ মোট ২১৪ জন যাত্রীকে পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ৭ এপ্রিল গভীর রাতে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শাপলাপুর সৈকত থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রলারটি যাত্রা শুরু করে। আইএসপিআর আরও জানায়, ট্রলারটিতে জীবন রক্ষার ন্যূনতম সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি বা কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা ছিল না, যা যাত্রীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।

উদ্ধারকৃতদের বুধবার সকালে টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। থানা প্রাঙ্গণে কথা হয় উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে দালালদের প্রলোভন ও প্রতারণার চিত্র। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৯ এর এক তরুণী জানান, সাড়ে সাত বছর ধরে ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপনের পর মালয়েশিয়ায় থাকা এক যুবকের সঙ্গে তার মুঠোফোনে বিয়ে হয় গত ৩ এপ্রিল। কথিত স্বামীর কাছে যেতে এবং পরিবারের উন্নত ভবিষ্যতের আশায় দালালকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি এই বিপদসংকুল যাত্রায় রাজি হন, যদিও সেই স্বামীর সঙ্গে তার কখনো দেখা হয়নি। নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর তিনি তার ভুলের বিষয়টি উপলব্ধি করেন।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে উখিয়ার কোটবাজার এলাকার এক বাংলাদেশি গাড়িচালকও রয়েছেন। তিনি জানান, ঈদের তৃতীয় দিন (২ এপ্রিল) তিনি টমটম চালানোর সময় যাত্রীবেশী দুজন তাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া পাহাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরে তাকে আরও ২০-২৫ জনের সঙ্গে চারদিন আটকে রেখে ৭ এপ্রিল রাতে জোর করে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়।

শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন জানান, দালাল চক্রটি মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরি ও বিয়ের লোভ দেখিয়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। আশ্রয়শিবির থেকে লোকজনকে বের করে উপকূল পর্যন্ত আনা এবং ট্রলারে তোলার জন্য একাধিক চক্র সক্রিয় ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল মিয়ানমারের জলসীমা হয়ে থাইল্যান্ডে পৌঁছে সেখান থেকে যাত্রীদের মালয়েশিয়া পাঠানো।

কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সালাউদ্দিন রশীদ তানভীর জানান, মঙ্গলবার রাতে উদ্ধারকৃতদের শাহপরীর দ্বীপ জেটিতে আনার পর বুধবার সকালে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকিদের পরিচয় যাচাই শেষে নিজ নিজ আশ্রয়শিবিরে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

পাঠকপ্রিয়