বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ দরজায় কড়া নাড়ছে, কিন্তু বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশ উদযাপন এবার গভীর সংকটের মুখে। সাগরে মাছের অপ্রতুলতা, বাজারে কম সরবরাহ, কথিত সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং আকাশছোঁয়া দামের কারণে এবারের নববর্ষে অনেকের পাতেই ইলিশ অধরা থেকে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যদিও পহেলা বৈশাখের মূল ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও, গত কয়েক দশক ধরে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা এই উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য ও আভিজাত্যের অংশে পরিণত হয়েছে। পাঁচ তারকা হোটেল থেকে শুরু করে সাধারণ রেস্তোরাঁ, এমনকি বর্ষবরণের উন্মুক্ত স্থানেও চড়া দামে বিক্রি হয় পান্তা-ইলিশ। এই একদিনের বিশেষ চাহিদাকে কেন্দ্র করে ইলিশের দাম বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রতি বছরের মতো এবারও ইলিশের বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সাগর ও নদীতে ইলিশের অস্বাভাবিক কম বিচরণের কারণে। চট্টগ্রামের বোট মালিকরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে মাছ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এছাড়া, চৈত্র মাসে প্রত্যাশিত ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় ইলিশের ঝাঁক নদীর মিঠা পানিতে প্রবেশ করেনি, যা সরবরাহ কমার অন্যতম প্রধান কারণ। বাজারে বড় আকারের ইলিশেরও দেখা মিলছে না, যদিও মিয়ানমার থেকে কিছু বড় ইলিশ আমদানি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকায় চট্টগ্রামের মাছ বাজারগুলোতে ইলিশের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। গতকাল কাজীর দেউড়ি ও কর্ণফুলী বাজারে এক কেজি ওজনের দেশি ইলিশ ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ২৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে, যদিও চড়া দামের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল কম। সুপার শপগুলোতেও দামের উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন সুপার শপে ৪০০ গ্রাম ওজনের জাটকা ১৭৫০ টাকা, ৬০০ গ্রাম ওজনের মাছ ২৪৫০ টাকা এবং ১২০০-১৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২৬৪৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের ২.৯৮ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টনে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে, বিশেষ করে নববর্ষের সময়।
তবে একটি ক্ষীণ আশার আলো দেখছেন কেউ কেউ। ইলিশ শিকারি বোট মালিক মোহাম্মদ কামরুল জানান, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরার উপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। এর আগে আজ-কালের মধ্যে সাগরে থাকা সব বোট ও ট্রলার ফিরে আসবে। এগুলো ফিরলে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়ে দাম সামান্য কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তা সত্ত্বেও, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের পহেলা বৈশাখে বহু বাঙালির পাতে ঐতিহ্যবাহী ইলিশের স্বাদ পৌঁছাবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।