বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে ট্রেন ভ্রমণ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আরামদায়ক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে ঈদ বা অন্যান্য উৎসবের সময় যাত্রীদের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এই বাহনটি। কিন্তু বহু বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া তেমনভাবে লাগেনি। বিলাসবহুল কোচ সংযোজন বা দ্রুতগতির ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর মতো উদ্যোগগুলো এখনও বাস্তবায়িত হয়নি, এমনকি রুটের সংখ্যাও সেভাবে বাড়েনি। উল্টো ইঞ্জিন, কোচ এবং ক্রু সংকটের মতো গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই সংকটের ফলে বর্তমানে দেশজুড়ে ৭৯টি বিভিন্ন রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ, যা যাত্রী ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা যদিও বলছেন যে তারা যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইঞ্জিন সংকটকে তারা প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন এবং জানাচ্ছেন যে নতুন ইঞ্জিন কেনা একটি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রেলের ইঞ্জিন যেহেতু দেশে উৎপাদিত হয় না, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইঞ্জিন হাতে পেতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যায়।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, এটি শুধুমাত্র অর্থের সংস্থান বা বাজেট সংকুলানের বিষয় নয়, বরং দাতা সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল একটি জটিল প্রক্রিয়া। তিনি জানান, বর্তমানে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে প্রায় ৯০টি নতুন ইঞ্জিন প্রয়োজন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার একটি প্রকল্প সম্প্রতি অনুমোদন পেলেও অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি।
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা রেলওয়ের এই ব্যাখ্যাকে অযুহাত হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, রেল কর্তৃপক্ষ সময়ের কাজ সময়ে করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, রেলওয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে যেখানে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং সময়মতো ইঞ্জিন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে এবং ঢিলেঢালা কর্মপদ্ধতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি আজও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, রেললাইন সম্প্রসারণের মতো প্রকল্প নেওয়া হলেও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইঞ্জিন, কোচ, ওয়াগন এবং বিশেষ করে দক্ষ জনবলের সংস্থান করা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, জনবল সংকটের কারণে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে, যা নিরাপদ রেল চলাচলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রেলওয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে মোট ২৯৭টি ইঞ্জিন রয়েছে, যার মধ্যে ১৬৭টি মিটারগেজ এবং ১৩০টি ব্রডগেজ। একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ২০ বছর ধরা হয়। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রেলের বহরে থাকা ৫১ শতাংশ ইঞ্জিনেরই, অর্থাৎ ১৫০টির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৮৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছরেরও বেশি, যা নিয়মিত চলাচল এবং সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বন্ধ থাকা ৭৯টি ট্রেনের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ৩৬টি লোকাল ও ডেমু ট্রেন এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭টি লোকাল ও মিশ্র ট্রেন। এর মধ্যে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে বিভিন্ন সময়ে ইঞ্জিন, কোচ বা ক্রু সংকটের কারণে ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ বাজার, ময়মনসিংহ-ভৈরব বাজার, সিলেট-ছাতকবাজার, চট্টগ্রাম-সিলেট (জালালাবাদ এক্সপ্রেস), ঢাকা-ময়মনসিংহ (ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস), আখাউড়া-সিলেট (কুশিয়ারা এক্সপ্রেস) রুটের লোকাল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়াও ‘এমসি আন্ডার রিপেয়ার’ বা মেরামতের কারণ দেখিয়ে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-বিশ্ববিদ্যালয়, লাকসাম-চাঁদপুর, লাকসাম-নোয়াখালী, ঢাকা-হাইটেক সিটি, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা এবং চট্টগ্রাম-পটিয়া রুটের কমিউটার ট্রেনগুলো বিভিন্ন সময়ে বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি ইঞ্জিন স্বল্পতার কারণে ঢাকা-যমুনা সেতু পূর্ব রুটের টাঙ্গাইল কমিউটার এবং ময়মনসিংহ-ভুয়াপুর রুটের ধলেশ্বরী কমিউটার ট্রেনও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পশ্চিমাঞ্চলের চিত্রও প্রায় একই। কোচ, ইঞ্জিন ও ক্রু সংকটের কারণে ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গোয়ালন্দঘাট-রাজবাড়ী, লালমনিরহাট-বুড়িমারী, পার্বতীপুর-চিলাহাটিসহ বেশ কয়েকটি রুটের লোকাল ও মিশ্র ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রুর অভাবে ২০১১ ও ২০১২ সালে পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটের কমিউটার এবং লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটের লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়। ইঞ্জিন ও ক্রু সংকটে ২০২১ সালে বন্ধ হয় সান্তাহার-বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্টেশন রুটের উত্তরবঙ্গ মেইল। ডেমু ট্রেন মেরামতের অধীনে থাকায় ২০২০ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে পার্বতীপুর-পঞ্চগড় এবং লালমনিরহাট-পার্বতীপুর রুটের কমিউটার সার্ভিস বন্ধ হয়। এছাড়া, যাত্রী সংখ্যা কম থাকার কারণ দেখিয়ে এবং নাশকতার আশঙ্কায় আরও কিছু ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আর চালু হয়নি। এর সাথে গত বছরের আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি আন্তঃদেশীয় ট্রেন – মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেসও (যা ছয়টি ট্রেন হিসেবে গণ্য) যুক্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, অন্যদিকে পুরোনো ইঞ্জিন, অপর্যাপ্ত কোচ, জনবল সংকট এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা – এই বহুমুখী সমস্যায় বাংলাদেশ রেলওয়ে জর্জরিত। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থাটি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।