সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

একনেকের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় বে টার্মিনাল: বন্দর পাবে ২৪ ঘণ্টা অপারেশনের ক্ষমতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা পরিকল্পনা, নকশা, অর্থায়ন ও ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় আটকে থাকার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহু প্রতীক্ষিত বে টার্মিনাল প্রকল্প। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে যাওয়া এই মেগা প্রকল্পটি আগামী ২০ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির প্রি–একনেক পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ায় বন্দর ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট মহলে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

নগরীর হালিশহর উপকূল থেকে দক্ষিণ কাট্টলীর রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হবে এই বে টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় এক দশক আগে, ২০১৩ সালে, ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে এবং বন্দরকে পরবর্তী একশ বছরের জন্য প্রস্তুত করতে এই महत्वाकांক্ষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে কিছু ভূমি সংগ্রহ ছাড়া প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি প্রায় থমকে ছিল, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশার জন্ম দেয়। নানা সময়ে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ পৃথকভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।

এই প্রেক্ষাপটে, বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি প্রকল্পের প্রধান তিনটি অংশ – দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল ও একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ, সমুদ্র চ্যানেল খনন ও ব্রেকওয়াটার নির্মাণ এবং রেল ও সড়ক সংযোগসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি – সবগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (বিটিএমআইডিপি) নামে একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করে। এই সমন্বিত প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার (৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ একক প্রকল্প ঋণ হতে পারে। বাকি প্রায় ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একনেকে প্রকল্পটির ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) অনুমোদিত হলেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং এরপরই প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হবে।

প্রস্তাবিত বিটিএমআইডিপি প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম বৃহৎ ব্রেকওয়াটার বা ঢেউ প্রতিরোধক প্রাচীর নির্মাণ করা হবে সমুদ্রের ডুবোচর ব্যবহার করে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এছাড়া, নেভিগেশন বা জাহাজ চলাচলের জন্য প্রবেশ চ্যানেল নির্মাণে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, নেভিগেশনে সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপনে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং রেল ও সড়ক সংযোগসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির সময় এই ব্যয়ের হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে ৯৩৯ একর জমিতে প্রকল্পটি শুরু করার কথা থাকলেও, সাগর ভরাট করে প্রায় আড়াই হাজার একর জমির ওপর একটি অত্যাধুনিক বন্দর সুবিধা গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা রয়েছে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটিও বেশ ধীরগতিতে চলছিল; ২০১৪ সালে আবেদন করার পর সিডিএ’র ছাড়পত্র পেতে দেড় বছর লেগে যায় এবং ২০১৭ সালে মাত্র ৬৭ একর জমি পাওয়া সম্ভব হয়। পরবর্তীতে আরও ৫০০ একর অধিগ্রহণ করা হলেও এখনো প্রায় ৩০০ একর জমির প্রয়োজন রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, একনেক অনুমোদনের পর ভূমি সংক্রান্ত জটিলতারও অবসান ঘটবে।

তিনটি টার্মিনালের মধ্যে একটি কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত পোর্ট অপারেটর পিএসএ এবং অপর কন্টেইনার টার্মিনালটি নির্মাণ করবে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই দুটি টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। তৃতীয় মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক বা দেশি-বিদেশি যৌথ অংশীদার নির্বাচনের লক্ষ্যে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বন্দর সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক প্রকল্পটির প্রি-একনেক অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আগামী ২০ এপ্রিল একনেক সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের সাথে ঋণচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ব্রেকওয়াটার ও চ্যানেল খননের কাজ শুরু হবে এবং একইসাথে টার্মিনাল নির্মাণের কাজও গতি পাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ব্রেকওয়াটার ও চ্যানেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং ২০৩১ সাল নাগাদ বে টার্মিনালে প্রথম জাহাজ ভিড়তে সক্ষম হবে।

এই নতুন টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে রীতিমতো বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে যেখানে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জাহাজ চলাচল করতে পারে, সেখানে বে টার্মিনালে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা জাহাজ ভেড়ানো ও ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৯.৫ মিটার গভীরতার এবং প্রায় ২২০০ টিইইউএস (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কন্টেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে, কিন্তু বে টার্মিনালে ১২ মিটার গভীরতার এবং ৪ থেকে ৫ হাজার টিইইউএস কন্টেইনারবাহী অনেক বড় জাহাজ সহজেই নোঙর করতে পারবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাহিদা মেটাতে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।

পাঠকপ্রিয়