সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ঘরে বসেই ব্যাংকিং: প্রতি মাসে রেকর্ড গড়ছে অনলাইন লেনদেন

উম্মে কুলসুম

তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রযাত্রায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। নগদ টাকার লেনদেন আর ব্যাংকের শাখায় লম্বা লাইনের দিন ফুরিয়ে আসছে। গ্রাহকরা ঝুঁকছেন ইন্টারনেট বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের দিকে। ঘরে বসেই আর্থিক লেনদেন, বিল পরিশোধসহ নানা পরিষেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই মাধ্যমে লেনদেন বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের পরিমাণ ১ লাখ ৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা নতুন এক মাইলফলক।

একসময় এক ব্যাংকের চেক অন্য ব্যাংকে জমা দিতে যেমন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, তেমনি টাকা পাঠাতে নির্ভর করতে হতো কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর। কেনাকাটা মানেই ছিল নগদ টাকার ঝনঝনানি। কিন্তু ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। লকডাউনের বিধিনিষেধ আর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মানুষ বাধ্য হয় অনলাইন মাধ্যমের দিকে ঝুঁকতে। সেই থেকেই শুরু হয় ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারের বিপ্লব, যা এখন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল এক মাসের ব্যবধানেই ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে লেনদেন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত ডিসেম্বরে যেখানে লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, সেখানে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসেই লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা বা ৫.৯০ শতাংশ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের জীবনযাত্রা সহজ করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতেও সাহায্য করছে এই ডিজিটাল পদ্ধতি। গত বছরের জুলাইয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় লেনদেন কিছুটা কমে ৮২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকায় নেমেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন লেনদেন আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং পূর্বের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের (জুলাই-জানুয়ারি) ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেন গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রায় দুই দশক আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। সময়ের সাথে সাথে প্রায় সব ব্যাংকই এই সেবা চালু করেছে এবং গ্রাহকদের জন্য নিত্যনতুন সুবিধা যোগ করছে। কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা পাঠানো, বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা, হিসাবে স্থিতি যাচাইসহ অসংখ্য ব্যাংকিং কার্যক্রম এখন ঘরে বসেই সেরে ফেলা যাচ্ছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী এই প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বলেন, “মানুষ এখন ঘরে বসেই ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। এটিএমের চেয়ে ইলেকট্রনিক লেনদেনে খরচও কম। তাই ব্যাংকগুলোও ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করছে। প্রযুক্তি এগিয়ে চলেছে, তাই অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বজুড়েই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ইন্টারনেট ব্যাংকিং গত পাঁচ বছরে একটি অতি প্রয়োজনীয় সেবায় রূপান্তরিত হয়েছে। একবার এই মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়ে গেলে গ্রাহকরা আর পুরনো পদ্ধতিতে ফিরছেন না।”

প্রযুক্তির কল্যাণে গ্রাহকদের হাতের মুঠোয় আসা এই ব্যাংকিং সুবিধা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করছে।

পাঠকপ্রিয়