মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

২২ চিকিৎসক চলে যাওয়ায় অচল চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, সংকটে আইসিইউ

মানু আকতার

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন সাতকানিয়া থেকে আসা মো. হোসেন। মায়ের তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে এখানে এসেছেন বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায়, কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও মেলেনি চিকিৎসকের দেখা। বহির্বিভাগে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়, কিন্তু চিকিৎসক অপ্রতুল। এই চিত্র শুধু হোসেনের নয়, আনোয়ারার বাসিন্দা রহিমারও, যিনি তার অসুস্থ বাবার জন্য একটি আইসিইউ শয্যার খোঁজে এখানে এসেছেন। চমেক হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে এখানে এলেও চিকিৎসকের দেখা পেতে তাকেও করতে হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা।

করোনা মহামারীর দুঃসময়ে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ‘আশার বাতিঘর’ হয়ে ওঠা এই হাসপাতালটি এখন নিজেই ধুঁকছে তীব্র চিকিৎসক সংকটে। সম্প্রতি হাসপাতালের সাথে সংযুক্ত ২২ জন চিকিৎসকের বদলির আদেশ এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বদলির পর এই চিকিৎসকরা নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

একসময় প্রায় নিষ্প্রাণ থাকা হাসপাতালটি কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হওয়ার পর নতুন জীবন পায়। জরুরি ভিত্তিতে ১০টি আইসিইউ শয্যা চালুর মাধ্যমে শুরু হয় এর নবযাত্রা, যা পরে ১৮টিতে উন্নীত করা হয়। নতুন লোকবল নিয়োগ ও ২২ জন চিকিৎসক সংযুক্ত করার মাধ্যমে হাসপাতালটি সে সময় সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করোনার প্রকোপ কমার পরেও আইসিইউসহ অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসায় এটি বিকল্প ভরসাস্থল হয়ে ওঠে। বর্তমানে মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স, গাইনি ও শিশু বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ রোগী ভর্তি থাকছেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন সহস্রাধিক মানুষ।

কিন্তু জনবলের অভাবে সেই আশার আলো এখন নিভু নিভু। বিশেষ করে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সেবা এখন প্রায় বন্ধের মুখে। ১৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র ৮টিতে রোগী ভর্তি করানো সম্ভব হচ্ছে, যার মধ্যে সচল ভেন্টিলেটর রয়েছে মাত্র একটিতে! বাকিগুলোয় শুধু অক্সিজেন ও অন্যান্য প্যারামিটার সচল থাকলেও জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অকেজো শয্যা ও ভেন্টিলেটর মেরামতের জন্য অধিদপ্তরে জানানো হলেও মূল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসক স্বল্পতা।

আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, “শয্যা ও ভেন্টিলেটর মেরামতের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন মূল সংকট চিকিৎসা কর্মকর্তা। হঠাৎ এত চিকিৎসক চলে যাওয়ায় ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কনসালট্যান্টরা পালা করে তা আপাতত সামাল দিচ্ছেন।”

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবদুল মান্নান স্বীকার করেন, “২২ জন চিকিৎসক একসঙ্গে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সেবার ব্যাঘাত ঘটছে। আমরা ডাক্তার চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখেছি। যে পরিমাণ ডাক্তার বর্তমানে রয়েছেন, তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার আইসিইউ সেবাদান অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

১০ বছর আগে হাসপাতালটিকে ১৫০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি। ২০২৪ সালের নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালের জন্য ১৭৭ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। এর মধ্যে ২০টি কর্মকর্তার পদ থাকলেও বিভিন্ন বিভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ৭ জন সহকারী রেজিস্ট্রার, ৬ জন জরুরি বিভাগে, ৫ জন বহির্বিভাগে এবং বাকিরা প্যাথলজি, ইউনানি, ডেন্টাল ও কারা বিভাগে নিযুক্ত।

একসময়ের আশার কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল আজ চিকিৎসক সংকটে ধুঁকছে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা, বিশেষ করে আইসিইউ সেবা। কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাঠকপ্রিয়