জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিপদ দশগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) একটি গবেষণা।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ওয়ান আর্থ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণা বলছে, যে মাত্রার শক্তিশালী ঝড় আগে ১০০ বছরে একবার আসত, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতিধারা অব্যাহত থাকলে তা প্রতি ১০ বছর বা তারও কম সময়ে আঘাত হানতে পারে। শুধু তাই নয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রচলিত মৌসুমেরও পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা দেশের উপকূলীয় কৃষি ও জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপকূলীয় মানুষের কাছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস নতুন কিছু নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকৃতির বৈরী আচরণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী ইউনিয়নের জালিয়াপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবী আবদুল গফুর বা নূর হোসেনের মতো শত শত পরিবার এখন জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারাচ্ছেন।
নূর হোসেন জানান, আগে বর্ষায় ঘরে তেমন পানি না উঠলেও গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে জলোচ্ছ্বাস যেন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার কবলে পড়ে তাদের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না গেলে আরও বহু পরিবার গৃহহীন হবে।
একই চিত্র সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালি বা বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের। সেখানকার আবদুল আলিম, হাফিজুর রহমান ও ফাতেমা খাতুনরা জানান, জলোচ্ছ্বাসের পর লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, মানুষ বাধ্য হচ্ছে পানি কিনে খেতে। বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনই এর মূল কারণ।
এমআইটি’র আর্থ, অ্যাটমোস্ফিয়ারিক এবং প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন উন্নত কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে। তারা ১৭৬০ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ২৬০ বছরের ঐতিহাসিক ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি ঘূর্ণিঝড় সিমুলেশন ব্যবহার করে দেখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঝড়ের আচরণে কী পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণায় ব্যবহৃত ‘স্টর্ম’ মডেলের অন্যতম উদ্ভাবক অধ্যাপক কেরি ইমানুয়েলও এই গবেষক দলের সদস্য।
মুখ্য গবেষক সাই জ্যান্ডার সাভেলা জানিয়েছেন, তাদের গবেষণার মূল বার্তা হলো, ভবিষ্যতের ঝুঁকি বুঝতে কেবল অতীতের তথ্যের ওপর নির্ভর করা যাবে না, কারণ জলবায়ু এরইমধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে এবং দুর্যোগের পুনরাবৃত্তির হার বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, এই গবেষণা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন, ইন্দোনেশিয়ার মতো একই ধরনের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বিভিন্ন মাত্রার কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতিতে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বর্তমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। শত বছরের ইতিহাসে যেখানে বড় ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা সাড়ে ৩ মিটারের কাছাকাছি দেখা গেছে, সেখানে ভবিষ্যতে সীমিত জলবায়ু পরিবর্তনেও তা ৪.৯ মিটার, মাঝারি পরিবর্তনে ৫ মিটার এবং তীব্র পরিবর্তনে ৫.৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বাদ দিলেও শুধু ঝড়ের তীব্রতা ও ধরনে পরিবর্তনের কারণে জলোচ্ছ্বাস ০.৬ থেকে ০.৯ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের উত্তরাংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, এরপরেই রয়েছে মেঘনা ও গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চল। আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হলো, ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম পরিবর্তন। এতদিন মূলত বর্ষার আগে (মার্চ-মে) ও পরে (অক্টোবর-নভেম্বর) তীব্র ঝড় হলেও ভবিষ্যতে বর্ষাকালেও (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) এবং বর্ষার পরেও (ডিসেম্বর) তীব্র জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা বাড়তে পারে। বর্ষাকালে নদীর পানির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাত বেশি থাকায় এই সময়ে ঝড় হলে তা ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা এমআইটি’র এই গবেষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেছেন, এই গবেষণা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিযোজন পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে সাহায্য করবে। তিনি মনে করেন, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বাংলাদেশের শতবর্ষী ‘ডেলটা প্ল্যান-২১০০’ পর্যালোচনার সময় এই গবেষণার ফলাফলকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহার নাইম ওয়ারা বলেন, ঝড়ের পুনরাবৃত্তির সময়কাল এভাবে কমে এলে দুর্যোগের মাত্রা, সময় ও স্থান পরিবর্তিত হবে, যা উপকূলীয় মানুষের যুগ যুগ ধরে অর্জিত দুর্যোগ মোকাবিলার সনাতনী জ্ঞানকে অকার্যকর করে দিতে পারে। তাই এলাকা ও মৌসুমভিত্তিক ফলিত গবেষণার ওপর তিনি জোর দেন।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্ ২০০৯ সালের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) কে বর্তমান বাস্তবতায় অচল উল্লেখ করে ২০২২ সালে গৃহীত জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) অবিলম্বে কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা অনেকাংশেই অতীতের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এমআইটি’র গবেষণা স্পষ্টভাবে বলছে, ভবিষ্যতের পরিবর্তিত জলবায়ু ও দুর্যোগের ধরন অনুযায়ী নকশা, নীতিমালা ও আর্থিক পরিকল্পনা হালনাগাদ না করলে সেই বিনিয়োগ ব্যর্থ হতে পারে। কারণ, আমরা এমন এক পৃথিবীর জন্য নির্মাণ করে যাব, যা বাস্তবে আর থাকবে না। গবেষক সাই সাভেলাও দুর্যোগের পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সেগুলোর তীব্রতা বাড়ছে বলে আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন। ২০২৩ সালেই মোখা, হামুন ও মিধিলি নামে তিনটি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক এর কারণ হিসেবে সমুদ্র ও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছেন।
নাসার ২০২১ সালের একটি গবেষণা এবং আইপিসিসি’র পর্যবেক্ষণও বঙ্গোপসাগরে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার কথাই বলে। এমআইটি’র এই গবেষণা সেই শঙ্কাকেই আরও জোরালো ভিত্তি দিল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের আসন্ন এই মহাবিপদ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের তাগিদ দিল।