আদালতে বছরের পর বছর ঘুরেও সমাধান মেলেনি, উল্টো জুটেছে হয়রানি আর মিথ্যা মামলা। কিন্তু সরকারি আইনি সহায়তা সংস্থার (লিগ্যাল এইড) দ্বারস্থ হয়ে মাত্র নয় মাসেই ১৩ বছরের পুরনো পারিবারিক সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার আবু তৈয়বের। শুধু সম্পত্তি বুঝে পাওয়াই নয়, মামাতো ভাইদের সঙ্গে জোড়া লেগেছে সম্পর্কের বন্ধনও।
আবু তৈয়বের মতো এমন অনেক অসহায় ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীর শেষ ভরসাস্থল হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়। বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে এখানকার বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা অনেকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
আজ সোমবার (২৮ এপ্রিল) দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দ্বন্দ্বে কোনো আনন্দ নাই, আপস করো ভাই, লিগ্যাল এইড আছে পাশে, কোনো চিন্তা নেই’। এ উপলক্ষে লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
আবু তৈয়ব জানান, মায়ের সম্পত্তি বুঝে পেতে ১৩ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ ও থানায় ঘুরেও লাভ হয়নি, উল্টো মিথ্যা মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। মামলা লড়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এক বন্ধুর পরামর্শে গত বছরের শুরুতে তিনি লিগ্যাল এইডে আবেদন করেন। আট দফা বৈঠক ও সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপের পর গত ২১ অক্টোবর এডিআর-এর মাধ্যমে তিনি মায়ের প্রাপ্য ভিটেবাড়ি, নাল জমি ও পুকুরের অংশ বুঝে পান। তিনি বলেন, “যেটা ৯ বছরেও হতো না, সেটি ৯ মাসে হয়েছে।”
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ) রূপণ কুমার দাশ বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত অভিযোগ এলে প্রথমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। এতে মাত্র ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই সমাধান হচ্ছে, যেখানে আদালতে বছরের পর বছর লেগে যায়। সমঝোতা না হলে তবেই ভুক্তভোগীর পক্ষে মামলা দায়ের করা হয়। তিনি জানান, ফৌজদারি, দেওয়ানি, পারিবারিক সব বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হলেও জমি সংক্রান্ত সমস্যা বেশি আসায় সেগুলোর সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেকেই এখনও জানেন না যে লিগ্যাল এইডে কম সময়ে দেওয়ানি সমস্যার সমাধান মেলে, তাই তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার চালানো হচ্ছে।
লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে মোট ১ হাজার ৫৩২টি আইনি সহায়তার আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানি আবেদন ছিল ২৬৪টি, যার ১৯৫টিই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। লিগ্যাল এইডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) এরশাদুল ইসলাম জানান, আবেদনকারীদের বেশিরভাগই নারী, যারা স্বামী বা বাবার বাড়ি থেকে সম্পত্তির ভাগ বুঝে পাচ্ছেন না।
আবেদন নিষ্পত্তির পাশাপাশি লিগ্যাল এইড অসচ্ছল ব্যক্তিদের মামলাও পরিচালনা করে। চট্টগ্রামে বর্তমানে ১০০ জন আইনজীবী প্যানেলভুক্ত রয়েছেন, যারা সরকারি খরচে ১৩ হাজার ৯৩০টি মামলা পরিচালনা করছেন (ফৌজদারি ১০,৯৬৮টি, পারিবারিক ২,৩৩৯ ও দেওয়ানি ৬২৩টি)।
চট্টগ্রাম আদালতে বর্তমানে ১ লাখ ১২ হাজারেরও বেশি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। আইনজীবীরা বলছেন, বিচারক সংকট, সমন জারি ও গ্রহণে দেরি, বারবার সময়ের আবেদন, ওয়ারিশ অন্তর্ভুক্তি, উচ্চ আদালতে যাওয়াসহ নানা কারণে বছরের পর বছর, এমনকি ৫ থেকে ৩০ বছরেও অনেক দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি হয় না।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার মনে করেন, লিগ্যাল এইডের এডিআর সেবা আদালতের মামলাজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আইনজীবী, জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সচেতন নাগরিকদের অসহায় বিচারপ্রার্থীদের লিগ্যাল এইডে আসার পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান।
২০০০ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কার্যক্রম চট্টগ্রামে পুরোদমে শুরু হয় ২০১১ সালে। চট্টগ্রাম চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে সশরীরে গিয়ে অথবা হটলাইন নম্বর ১৬৪৩০-এ ফোন করে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়।