১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় যখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মৃত্যুপুরী বানিয়েছিল, ঠিক তখনই ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল’ নামে পরিচিত সেই অভিযান কেবল তাৎক্ষণিক राहत দেয়নি, আনুমানিক ২ লাখ মানুষের জীবনও বাঁচিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ত্রাণ তৎপরতা, যা সদ্য উপসাগরীয় যুদ্ধ ফেরত মার্কিন সেনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিচালিত হয়েছিল।
মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত বাংলাদেশ
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগের ক্যাটাগরি ফোর ঘূর্ণিঝড় এবং তার সাথে প্রায় ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে। এই বিধ্বংসী ঝড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং এক কোটির বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ঝড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, টেলিকমিউনিকেশনসহ দেশের একটি বড় অংশের অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। এই চরম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে আরও লাখো মানুষের জীবননাশের আশঙ্কা দেখা দেয়।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতিতে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ফোন করেন। ৩ মে’র সেই ফোনালাপের পরই মার্কিন সাহায্য সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর একটি দল ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে চট্টগ্রামে আসে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট বুশ প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন নৌবহরকে বাংলাদেশের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেন।
উপসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে: অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম) শেষ হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরাকের পরাজয়ের পর মার্কিন মেরিনসহ প্রায় ৮ হাজার সদস্যের একটি এম্ফিবিয়াস টাস্কফোর্স (এটিএফ) বঙ্গোপসাগর হয়ে দেশে ফিরছিল। প্রেসিডেন্ট বুশের নির্দেশে ১০ মে সেই নৌবহর বাংলাদেশের উপকূলে এসে পৌঁছায়। জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত থ্রি মেরিন এক্সপেডিশনারি ব্রিগেডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল হেনরি সি. স্টাকপোলের নেতৃত্বে মার্কিন মেরিন, নৌসেনা, সেনাবাহিনী ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই ত্রাণ অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নেয়।
ইউএস মেরিন ক্রপসের হিস্টরি অ্যান্ড মিউজিয়াম ডিভিশন থেকে প্রকাশিত চার্লস আর স্মিথের লেখা ‘অ্যাঞ্জেলস ফ্রম দ্য সি: রিলিফ অপারেশন ইন বাংলাদেশ’ বইতে এই অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। জেনারেল স্ট্যাকপোল ঢাকায় এসে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দিন খান এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলামের সাথে বৈঠক করে একটি সমন্বিত ত্রাণ পরিকল্পনা করেন।
ত্রাণ তৎপরতা ও বেঁচে যাওয়া জীবন
জেনারেল স্ট্যাকপোলের কথায়, তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল দুর্গত মানুষের মৃত্যু ঠেকানো এবং দ্বিতীয়ত খাদ্য, পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা – অর্থাৎ যত বেশি সম্ভব জীবন বাঁচানো।
মার্কিন মেরিনদের হেলিকপ্টার এবং উভচর ল্যান্ডিং ক্র্যাফট এয়ার কুশন (এলসিএসি) ব্যবহার করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সন্দ্বীপ, ভোলা, হাতিয়া, বাঁশখালীর মতো দুর্গম দ্বীপগুলোতে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো শুরু হয়। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে সাংবাদিক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম লিখেছেন, তিনি মেরিনদের সাথে হেলিকপ্টারে উপদ্রুত এলাকা ঘুরেছেন এবং দেখেছেন কীভাবে দ্রুতগামী উভচর যানের সাহায্যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে ও দূষিত পানিকে ওয়াটার পিউরিফিকেশন মেশিনে বিশুদ্ধ করা হচ্ছে।
চার্লস আর স্মিথের বই অনুসারে, অপারেশন সি অ্যাঞ্জেলের মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাছে ৪ হাজার টন খাদ্য এবং ২৬৬ হাজার গ্যালন বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া হয়। অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতালে প্রায় ১৫ হাজার গুরুতর অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা না হলে আরও অন্তত ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারত।
তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম এই অভিযান সম্পর্কে বলেন, “বিপর্যয় যখন আসে, তখন মানুষই পারে তাকে বিজয়ে পরিণত করতে।”
অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মূল্যবান অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পরেও মার্কিন সহায়তা এসেছিল ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল-২’ নামে।