অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা এবং শৃঙ্খলা আনতে প্রথমবারের মতো একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এতে কোনো বিচারকের এক কর্মস্থলে সর্বোচ্চ তিন বছর এবং চৌকি আদালতে সর্বোচ্চ দুই বছর দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির নির্দেশনার আলোকে তৈরি চার পৃষ্ঠার এই খসড়া নীতিমালাটি কার্যকরের জন্য সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে।
নীতিমালায় বিচারকের কর্মস্থল নির্ধারণে বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— কোনো জেলায় বিচারক বা তার পরিবারের সদস্যদের নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি কেনা জমি থাকলে বা নিকটাত্মীয় আইন পেশায় যুক্ত থাকলে সেখানে তাকে পদায়ন না করা এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই জেলায় নিয়োগ না দেওয়া।
বিচার বিভাগ পৃথক্করণের দেড় যুগের বেশি সময় পার হলেও অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়নে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ে অতীতে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি; গত সাত মাসেই অন্তত ২০ জন বিচারককে একাধিকবার বদলি করার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন নীতিমালাকে স্বাগত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত জেলা জজ) মো. মোয়াজ্জেম হোছাইন বলেন, “বদলি ও পদায়ন নীতিমালা প্রণয়নে জুডিশিয়াল সার্ভিস সদস্যদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। প্রধান বিচারপতি গত সেপ্টেম্বরে অভিভাষণে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এটি বাস্তবায়িত হলে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।”
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে অন্তত ১৪২ জন বিচারক দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের সদ্য পদত্যাগ করা যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ১) বিকাশ কুমার সাহা প্রায় ২০ বছর ঢাকায় বিভিন্ন পদে ছিলেন। এছাড়া ১৫ বছরের বেশি সময় ঢাকায় থাকা বিচারকের সংখ্যা সাতজন এবং ১০ বছরের বেশি ছিলেন ৪৪ জন। ৫ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশে কর্মরত ছিলেন আরও ৭৩ জন বিচারক।
নতুন এই খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাধারণভাবে একজন বিচারক একটি কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে উপজেলা পর্যায়ের চৌকি আদালতে এই মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগে কোনো বিচারককে চৌকি আদালতে পাঠানো যাবে না এবং তার সম্মতি ছাড়া চাকরি জীবনে একবারের বেশি সেখানে পদায়ন করা যাবে না।
বিচারকদের প্রথম পদায়ন হবে দেওয়ানি আদালতে। এরপর যতদূর সম্ভব দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে পালাক্রমে তাদের বদলি করা হবে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো বিচারককে জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা (এলএও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো বিচারককে পরপর দুইবার একই কর্মস্থলে বদলি বা পদায়ন করা যাবে না। তবে বদলির এক বছরের মধ্যে পদোন্নতি পেলে তিনি একই জেলার কোনো শূন্য পদে পদায়ন পেতে পারেন। বদলির ক্ষেত্রে অবশ্যই পদ শূন্য থাকতে হবে।
স্বার্থের সংঘাত এড়াতেও বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে। যেমন, কোনো বিচারকের স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি বা ভাই-বোন যে জেলায় আইন পেশায় যুক্ত, সেখানে তাকে পদায়ন করা হবে না।
একইভাবে, নিয়োগের আগে কোনো বিচারক কোনো জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য থাকলে, নিয়োগের পরের পাঁচ বছর তিনি ওই জেলায় কোনো দায়িত্ব পাবেন না।
আবার, কোনো জেলায় যদি বিচারক নিজে বা তার স্বামী/স্ত্রী অথবা সন্তানের নামে ক্রয়সূত্রে ৩০ শতাংশের বেশি কৃষি বা ১০ শতাংশের বেশি অকৃষি জমির মালিক হন, তাহলেও তিনি সেখানে পদায়ন পাবেন না।
বিচারককে তার নিজের বা স্বামী/স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানার জেলায় কোনো বিচারিক পদে বদলি বা পদায়ন করা যাবে না – এমন বিধানও রাখা হয়েছে নীতিমালায়।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার কর্মবিভাগের কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তা প্রযুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও এতদিন এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা ছিল না। খসড়া এই নীতিমালা আইনে পরিণত হলে বিচারক বদলি ও পদায়নে আরও স্বচ্ছতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।