সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বিদ্যুৎ ব্যবহারে পিছিয়ে বাংলাদেশ, তবুও প্রতি ইউনিটে জিডিপি সংযোজন ‘অস্বাভাবিক বেশি’

বিদ্যুতের ভোগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ‘অস্বাভাবিক’ ফারাক, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়লে বিদ্যুতের ভোগও আনুপাতিক হারে বাড়বে— অর্থনীতির এই চিরায়ত নিয়মের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্যে প্রায়শই বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে। কখনো বিদ্যুতের ব্যবহার কমেও উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, আবার কখনো ব্যবহার বাড়লেও কমেছে প্রবৃদ্ধির হার। এই ‘অস্বাভাবিক’ অসামঞ্জস্য দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের ভোগ ঋণাত্মক (দশমিক ৪৪ শতাংশ) থাকলেও সে সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বিপরীত চিত্র দেখা যায় ২০২৪ সালে; এ বছর বিদ্যুতের ভোগ ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বাড়লেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে নেওয়া ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান ২০১০’-এ প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ১০ শতাংশ হারে বাড়ার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এই বিবেচনায় গত দেড় দশকে ৯০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়, যার বেশিরভাগই বিশেষ আইনের আওতায় সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ব্যক্তিরা পান। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৫ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট থেকে চলতি বছরের মার্চ নাগাদ ২৭ হাজার ৬৪৫ মেগাওয়াটে (ক্যাপটিভ ছাড়া) উন্নীত হয়েছে – যা প্রায় ৪ দশমিক ৭৫ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু এই বিপুল সক্ষমতার বিপরীতে গত বছরের ৩০ এপ্রিল সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় অনেক কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে সরকারকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, “সাধারণত জিডিপির প্রবৃদ্ধি যে হারে হয়, জ্বালানি প্রবৃদ্ধিও সে হারে হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখন সেটি দেখতে পাই না। শিল্প খাতে বিদ্যুৎ চাহিদার সামঞ্জস্যতা ওই অর্থে হয়নি।” তবে তিনি ক্ষুদ্র শিল্পে প্রবৃদ্ধি এবং সার্বিকভাবে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে, বৈশ্বিক অবস্থান ১২২তম এবং এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেরও নিচে। ফ্রান্সভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনারডাটার তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের ভোগ বেড়েছে ৩ শতাংশ হারে, যা ছিল তৎকালীন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নকে বড় করে দেখাতে জিডিপির পরিসংখ্যানকে ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখিয়েছে, যা প্রকৃত আকারের চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার বেশি হতে পারে। তাদের মতে, বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেসের ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক আউটলুক ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপির আকার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্ন তুলেছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বাংলাদেশ কীভাবে ভারত, পাকিস্তান বা চীনের চেয়ে ৫০-৬০ শতাংশ বেশি অর্থনৈতিক উৎপাদন দেখাতে পারে?

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারে বাংলাদেশের জিডিপিতে যোগ হয়েছে ২৬ দশমিক ৬ ডলার, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭ দশমিক ৮, ভারতে ১২ এবং পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৭ ডলার।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির বলেন, “আমাদের ব্যয়ভিত্তিক পদ্ধতিতে জিডিপি হিসাব করায় সরকারের ঋণ করা ব্যয়ও জিডিপিতে চলে আসছে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ন হয়েছে।”

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, “বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য অতিরঞ্জনের সুযোগ কম থাকায় সেটিকে বেশি বাস্তব মনে হচ্ছে। জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে যে এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।”

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্রিড লাইনের বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না পাওয়ায় তারা ক্যাপটিভ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার সেই অর্থে বাড়েনি, বরং গ্যাস সংকটকে সামনে এনে জ্বালানি সংকট বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মূলত অবকাঠামোগত বিনিয়োগকে ভিত্তি করে। যে কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধির প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশে শিল্প খাতে বিগত প্রায় এক দশকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হয়নি।” তিনি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রাক্কলন আলাদাভাবে করার ওপর জোর দেন।

পাঠকপ্রিয়