মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

এক দশকে ব্যয় বৃদ্ধি ১০ গুণ; স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

কালুরঘাট সেতু: ৭০০ মিটারে ১১ হাজার কোটির প্রশ্ন, পদ্মা ছুঁইছুঁই ব্যয়!

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বহু প্রতীক্ষিত কালুরঘাট ‘রেল কাম রোড’ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে বুধবার (১৪ মে)। তবে ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যের মূল সেতুর বিপরীতে পুরো প্রকল্পের জন্য ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়বরাদ্দ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কিলোমিটারপ্রতি হিসাবে এই ব্যয় দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতুর কাছাকাছি হওয়ায় এটিকে উচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে দেখছেন অনেকে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে কর্ণফুলী নদীর ওপর এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল সেতু মাত্র ৭০০ মিটার দীর্ঘ হলেও প্রকল্পের আওতায় দুই প্রান্তে ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার রেল ভায়াডাক্ট, ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক ভায়াডাক্ট এবং ৪ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও অধিগ্রহণ করতে হবে ১৪১ একরের বেশি জমি। মূলত এই আনুষঙ্গিক বিশাল কর্মযজ্ঞের কারণেই মূল সেতুর তুলনায় মোট প্রকল্প ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা (ডিপিপি) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূল পদ্মা সেতু নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা এবং যমুনা রেল সেতুতে (মূল অংশ) কিলোমিটারপ্রতি লেগেছে ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। সে তুলনায় কালুরঘাটের ৭০০ মিটার মূল সেতুর জন্য কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। মূল সেতুর ব্যয় তুলনামূলক কাছাকাছি মনে হলেও, ভায়াডাক্ট ও অন্যান্য কাজের ব্যয়ে রয়েছে বড় পার্থক্য।

তথ্যমতে, কালুরঘাট সেতুর জন্য ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার রেল ভায়াডাক্ট নির্মাণেই ব্যয় হবে ৪ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, যা এই প্রকল্পের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ। পদ্মা সেতুর সিঙ্গেল লাইন রেল ভায়াডাক্টে কিলোমিটারপ্রতি খরচ যেখানে ২৬৩ কোটি টাকা, সেখানে কালুরঘাটের ডাবল রেল লাইনের প্রতি কিলোমিটার ভায়াডাক্টের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৩ কোটি টাকা।

অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভায়াডাক্টের উচ্চতা নির্মাণ ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কালুরঘাট সেতুর জন্য ১২ দশমিক ২ মিটার নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স রাখা হলেও পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট নির্মিত হয়েছে ১৮ মিটার ক্লিয়ারেন্স রেখে। অর্থাৎ, পদ্মার চেয়ে কম উচ্চতার ভায়াডাক্ট নির্মাণ করেও কালুরঘাটে খরচ বেশি দেখানো হচ্ছে। যদিও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দাবি করেছেন, ২০১৮ সালের ডিপিপির তুলনায় ২০২৪ সালের ডিপিপিতে সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করতেই ব্যয় বেড়েছে। তিনি আরও জানান, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) প্রাথমিক সমীক্ষার ভিত্তিতে এই ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বানের পর চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারিত হবে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিবেশী দেশ ভারতে দীর্ঘতম রেল ভায়াডাক্টে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে মাত্র ৫২ কোটি টাকা, যা কালুরঘাট প্রকল্পের ভায়াডাক্ট ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য।

দশ বছরে ব্যয় বৃদ্ধি ১০ গুণ

কালুরঘাটে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এক দশকেরও বেশি সময় আগে। ২০১৪ সালে নতুন সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে একটি ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা এবং সেতুতে ছিল সিঙ্গেল রেল লাইনের সংস্থান। কিন্তু ২০২৪ সালে নতুন ডিপিপিতে সেই ব্যয় প্রায় ১০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায়! নতুন ডিপিপিতে কাজের পরিধি বাড়িয়ে সড়ক ও রেলপথের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, সিঙ্গেল লাইনের বদলে ডাবল রেল লাইন এবং নতুন করে ভায়াডাক্ট যুক্ত করা হয়েছে।

এই বিপুল ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক মনে করেন, যেহেতু সেতুর নির্মাণকাজের জন্য এখনো দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, তাই খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, “প্রকল্পটি যেহেতু সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে হচ্ছে না, আমরা আশা করতেই পারি দরপত্র প্রক্রিয়াটি প্রতিযোগিতামূলক হবে। এতে ডিপিপিতে যদি প্রকল্প ব্যয় বেশি অনুমান করা হয়েও থাকে, তা দরপত্র প্রক্রিয়ায় সংশোধিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।” তিনি প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কালুরঘাট সেতু। তবে এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো দ্রুত নিরসন করে একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে – এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

পাঠকপ্রিয়