মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

এক সময়ের ‘দারুল আদালত’ ও জলদস্যুদের কেন্দ্র আজ বিষধর সাপের আখড়া; সংরক্ষণ করে হেরিটেজ পর্যটনের দাবি।

জলদস্যুদের গুপ্ত দুর্গ থেকে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’: হারাচ্ছে চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন?

তরিকুল হাসান

চট্টগ্রাম নগরীর হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়ের গভীরে, ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে এক ‘রহস্যময়’ ভবন। স্থানীয়দের মুখে মুখে এটি ‘ভূতুড়ে বাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়, এটি শুধুই পরিত্যক্ত কোনো অট্টালিকা নয়, বরং চট্টগ্রামের বুকে প্রায় ৪০০ বছরের পর্তুগিজ শাসনের নীরব সাক্ষী, এক সময়ের ‘দারুল আদালত’ – অর্থাৎ চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন। আর স্থানীয়ভাবে এর আরেক নাম ‘পর্তুগিজ ভবন’।

কালের করাল গ্রাসে ভবনটি আজ প্রায় ধ্বংসস্তূপ। ভেতরে গেলেই চোখে পড়বে বিষধর সাপের অসংখ্য গর্ত, চারপাশ ঘিরে রেখেছে আগাছার জঙ্গল। অথচ একদিন এই প্রাঙ্গণ ছিল বিচারক, আইনজীবী আর শোষিত-শাসিতের কোলাহলে মুখর। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় চার শতাব্দীর পুরনো এই স্থাপনা নির্মাণ করেছিল পর্তুগিজরা, যারা চট্টগ্রামে এসেছিল বাণিজ্যের নামে, কিন্তু জড়িয়ে পড়েছিল জলদস্যুতার মতো ভয়ঙ্কর সব কর্মকাণ্ডেও।

পর্তুগিজদের বিচার থেকে আমোদ-প্রমোদ

ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্তুগিজদের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি তারা নিজেদের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাজের জন্য নির্মাণ করে এই ঐতিহাসিক ভবন। এর নির্মাণকাল নিয়ে ১৬৬৬ বা ১৭৬১ সালের মতো ভিন্ন মত থাকলেও, ইতিহাসবিদরা একমত যে, এটি ছিল পর্তুগিজদের শাসন, বিচার এবং একই সঙ্গে আমোদ-প্রমোদের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

লোকমুখে প্রচলিত, এই ভবনের নিচ দিয়ে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ ছিল। এই সুড়ঙ্গ দিয়েই নাকি পর্তুগিজরা তাদের লুট করা ধনসম্পদ আনানেওয়া করত এবং শহর ছাড়ার সময় এই পথই ব্যবহার করেছিল। কথিত আছে, পালানোর সময় তারা সেই সুড়ঙ্গপথ সিলগালা করে দেয়, যা আজ আর দৃশ্যমান নয়। এমনকি ভবনের নিচে ছিল গোপন কক্ষ, যেখানে মজুদ থাকত তাদের লুট করা মালপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র। এই ভবনই ছিল পর্তুগিজদের প্রমোদালয়, যেখানে প্রতি রাতে বসত নাচ-গান আর আমোদের আসর।

স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

২০ কক্ষের এই দোতলা ভবনটির প্রতিটি তলায় রয়েছে একটি করে কেন্দ্রীয় কক্ষ, যার চারপাশে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো অন্য কক্ষগুলো। ভবনের তিনটি সিঁড়ির মধ্যে একটি পেঁচানো সিঁড়ি বিশেষভাবে নজর কাড়ে, যা মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র ১০ ইঞ্চি চওড়া দেয়ালগুলো তৈরি হয়েছে শুধু ইট দিয়ে, তাতে নেই কোনো সিমেন্ট বা আধুনিক নির্মাণ উপকরণের ছোঁয়া। ভবনের ছাদে থাকা দুটি ছোট গম্বুজ একসময় পাহারাদারদের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখান থেকে পুরো চট্টগ্রাম শহর নজরে রাখা যেত।

২০০৯ সালে মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের যৌথ সমীক্ষায় উঠে আসে, এই ভবনের নির্মাণশৈলী মোগল, ব্রিটিশ কিংবা আধুনিক কোনো স্থাপত্যরীতির সঙ্গেই মেলে না। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই এটিকে পর্তুগিজদের তৈরি স্থাপনা হিসেবে জোরালোভাবে চিহ্নিত করা হয়।

কালের পরিক্রমায় ‘দারুল আদালত’

পর্তুগিজদের পতনের পর ভবনটির ইতিহাসে যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়। ১৮৩৫ সালে দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিনের ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে গঠিত ‘মহসিন ফান্ড’-এর অর্থে ১৮৭৪ সালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম মাদ্রাসা – মোহসিনিয়া মাদ্রাসা। এর পাঁচ বছর পর, ১৮৭৯ সালে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ৩০ হাজার টাকায় ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে এই পর্তুগিজ ভবনসহ পুরো পাহাড়টি কিনে নেয়। পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে মহসিন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে, ইতিহাসের সাক্ষী এই ভবনটি কিছু সময়ের জন্য কলেজের ছাত্রাবাস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

বর্তমান করুণ দশা ও অবহেলা

মহসিন কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর কামরুল ইসলাম জানান, “২০০২ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তখন থেকেই এর সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ভবনে প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।”

সাবেক এক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণ করে বলেন, “৯০’র দশকে আমরা এই ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। ভেতরে ঢোকার সাহস না পেলেও, ভাবতাম এর দেয়ালের পরতে পরতে কত অজানা ইতিহাস চাপা পড়ে আছে।”

আজ সেই ইতিহাসের সাক্ষী ভবনটি নিজেই ইতিহাসের পাতায় বিলীন হতে চলেছে। এর সংরক্ষণে নেই কোনো দৃশ্যমান সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ। নেই কোনো পর্যটন পরিকল্পনা বা গভীর গবেষণার আয়োজন। অথচ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবনটিকে ইতিহাস শিক্ষার কেন্দ্র, হেরিটেজ মিউজিয়াম অথবা আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন তরুণ প্রজন্ম তাদের শহরের সমৃদ্ধ অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে, তেমনি স্থানীয় পর্যটন শিল্পেও যুক্ত হবে এক নতুন মাত্রা।

উত্তরণের পথ কী?

এক তরুণ ইতিহাসবিদের কথায়, “এই ভবনটি একটি জীবন্ত দলিল। আমরা যদি এখনই এর সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিই, তাহলে একদিন শুধু ছবির অ্যালবামেই আমাদের এই অমূল্য ইতিহাস সীমাবদ্ধ থাকবে।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “এই ভবন যদি কোনো পশ্চিমা দেশে থাকত, তবে এতদিনে এর চারপাশে সুরক্ষার বলয় তৈরি হতো, সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ হতো মোটা অঙ্কের তহবিল।”

যদিও ভবনটির মূল নির্মাতা পর্তুগিজ নাকি এটি মুঘল বা ব্রিটিশ আমলের – এ নিয়ে ভিন্নমতও প্রচলিত আছে (যেমনটা কিছু স্থানীয় তথ্যসূত্র ও উইকিপিডিয়া পেজে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এবং ব্রিটিশ আমলে এর ব্যবহার ছিল), তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। চট্টগ্রামে এটি ‘দারুল আদালত’ বা প্রথম বিচারালয় হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীকালে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

চট্টগ্রামের মতো এক ঐতিহাসিক বন্দরনগরীতে, যেখানে পর্যটন আর ইতিহাস একে অপরের হাত ধরে বিকশিত হতে পারে, সেখানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রতি এই অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রয়াস। না হলে, চট্টগ্রামের এই ‘পর্তুগিজ ভবন’ বা ‘দারুল আদালত’ অচিরেই পরিণত হবে এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ে, যার সাক্ষী থাকবে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ইতিহাসের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতিচিহ্ন।

পাঠকপ্রিয়