মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

এক দশকে আমের চাষাবাদ দ্বিগুণ, ১৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের সোনালী ফসল আম এখন কেবল রসনাবিলাস নয়, দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অনুকূল মাটি ও জলবায়ু, এককালীন বিনিয়োগে তুলনামূলক বেশি লাভ, উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের বিশাল স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষাবাদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুরের মতো ঐতিহ্যবাহী আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর পাশাপাশি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি পাহাড়ি অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে আমবাগান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে দেশে আমের আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, যা এই খাতের অপার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন এই সুমিষ্ট ফল রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখছে।

দেশের কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যে মৌসুমের শুরুতে আসা গুটি জাতের আম পাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। তবে ফলের রাজা খ্যাত সুস্বাদু হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, ফজলি সহ অন্যান্য জনপ্রিয় জাতের আম ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাজারে আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও টাঙ্গাইল – এই ৯টি প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলায় চলতি বছর প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এখান থেকে প্রায় ১৩ লাখ ৬৩ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ আমের বাজারমূল্য এবার প্রায় ১৫ হাজার ২১ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চাষি, ব্যবসায়ী এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দেশের বিভিন্ন ব্যুরো অফিস ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের সূত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রাজশাহীর হাতছানি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের

গত বৃহস্পতিবার থেকে রাজশাহীতে আনুষ্ঠানিকভাবে গুটি জাতের আম পাড়া শুরু হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এই আম ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো জাতের আম বাজারে আসতে কিছুটা দেরি হলেও চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আম চাষকে ঘিরে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই ১৬০০ কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করা হচ্ছে। কৃষকরা আশা করছেন, এবার তারা আমের ভালো দাম পাবেন।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন ঘোষিত ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, গোপালভোগ আম ২২ মে থেকে সংগ্রহ করা যাবে। লকনা, লক্ষণভোগ ও রানীপছন্দ আম পাড়া যাবে ২৫ মে থেকে। এছাড়া হিমসাগর ও ক্ষীরশাপাত ৩০ মে, ল্যাংড়া ও বানানা ম্যাংগো ১০ জুন এবং আম্রপালি ও ফজলি আম ১৫ জুন থেকে সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু জানান, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এবার যে পরিমাণ আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, এ বছর গাছগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আম ধরেছে। গত বছরের কম উৎপাদন এবার ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কারণ আমের ফলন সাধারণত এক বছর ভালো হলে পরের বছর কিছুটা কম হয়, এবং এটি পর্যায়ক্রমে ঘটে। রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমের মুকুল ভালো হয়েছে এবং গাছে প্রচুর আম টিকে আছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে সালমা জানান, রাজশাহী জেলায় এবার ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে এবং ২ লাখ ৬০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

আম উৎপাদনে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা শীর্ষে। জেলার এক-তৃতীয়াংশ আম এখানেই উৎপাদিত হয়। এখানকার আম মিষ্টি হওয়ায় বিদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গত বছর বাঘা উপজেলা থেকে ৩৬ মেট্রিক টন আম ৭ থেকে ১০টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে এবং চাষি ও ব্যবসায়ীরা ভালো দাম পেয়েছেন। এ বছরও বাঘা থেকে বিপুল পরিমাণ আম রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে আমের মিষ্টি সুবাস, ৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আশা

জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের আম বাগানগুলোতে এখন আমের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২২ মে থেকে নওগাঁর আম বাজারে আসা শুরু হবে। চাষিরা বলছেন, আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূলে থাকায় গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবার আমের ফলন দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবুল কালাম আজাদ জানান, এ বছর জেলায় ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে এখান থেকে ৩ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। সে হিসাবে এ বছর নওগাঁ থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, গত ১০ বছরে নওগাঁয় আম চাষ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৫ সালে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হলেও বর্তমানে তা ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর ছাড়িয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, ভালো ফলন এবং আম চাষ লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই প্রায় এক থেকে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে নতুন করে আমের আবাদ হচ্ছে।

নওগাঁর প্রায় ৩০ লাখ মানুষের আমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। বাকি প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন আম দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রংপুর এবং নারায়ণগঞ্জে নওগাঁর আম যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নওগাঁর আম বিদেশেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
আম রফতানিতে বড় লক্ষ্যমাত্রা, নতুন গন্তব্য চীন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত ও সুস্বাদু আম বাজারে উঠতে শুরু করবে। এ বছর জেলায় প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্য হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, জেলার ৫টি উপজেলায় ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমিতে নানা জাতের প্রায় ৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০টি আমগাছ রয়েছে। চলতি বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২৯২ মেট্রিক টন। আধুনিক পদ্ধতি ও বাণিজ্যিকভাবে আমচাষে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসায় গত ১০ বছরে এই জেলায় প্রায় ১৩ হাজার ২৪৪ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ বেড়েছে। আম গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোখলেসুর রহমান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুস্বাদু আমের উৎপাদন হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বরাবরই প্রসিদ্ধ। এই জেলার মানুষ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ মেট্রিক টন আম দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে পাঠিয়ে থাকে। এছাড়াও কয়েক বছর ধরে এশিয়ার ১১টি দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি এবং ইউরোপের সাতটি দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রপ্তানি হচ্ছে।

অন্যান্য জেলার চিত্র

নাটোরে এবার ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ১৫ মে থেকে নাটোরে গুটি আম পাড়া শুরু হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে।

দিনাজপুরে ১৩টি উপজেলাতেই আমের বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। ২৫ মে থেকে এই জেলার আম বাজারে আসবে। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান জানান, এবার সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হবে। গত ১০ বছরে এখানে প্রায় ১ হাজার ১৬ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ বেড়েছে। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেন জানান, তারা নিরাপদ আম উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা করছেন।

**সাতক্ষীরার** সুস্বাদু আমের খ্যাতি এখন বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। মাটি ও আবহাওয়ার কারণে সাতক্ষীরা আম চাষের জন্য খুব উপযোগী। এবার ৪ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১২০ মেট্রিক টন বাছাই করা আম ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, সলিডারিডাড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে সাতক্ষীরার আম বিদেশে যাচ্ছে।

মেহেরপুরে এবার ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং প্রায় ২৭০ কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার টাকার আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৫০ হেক্টর জমিতে রপ্তানিযোগ্য হিমসাগর আম রয়েছে। গত ১০ বছরে এখানে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামসুল আলম জানিয়েছেন, এবার মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টি হওয়ায় ফলন ভালো হবে আশা করা যায় এবং রপ্তানি বাড়লে আয়ও বাড়বে। গত মৌসুমে মেহেরপুর থেকে ৫০ টন হিমসাগর রপ্তানি হয়েছিল, এবার ১০০ টনের বেশি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

টাঙ্গাইলে বাণিজ্যিক আম চাষ বাড়াতে নানা পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি বিভাগ। উঁচু জমিতে তুলনামূলক কম পরিশ্রমে লাভজনক হওয়ায় আম চাষ বাড়াতে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। টাঙ্গাইল খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মো. আশেক পারভেজ জানান, টাঙ্গাইলকে আমের এক্সপোর্ট জোন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

চুয়াডাঙ্গায় গত বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম নিজে উপস্থিত থেকে আম পাড়া উদ্বোধন করেন। চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার ২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে এবং প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন আশা করা হচ্ছে, যার মূল্য ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দুয়ার, চীন কিনবে ১.২ লাখ টন আম

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের আম এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেই এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রায় ২১টি দেশে আম রপ্তানি হয়েছে। এবার রপ্তানি বাণিজ্যে যোগ হচ্ছে নতুন ও সম্ভাবনাময় বাজার চীন। ইতোমধ্যে চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ‘উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণযোগ্য আমের বাগান’ পরিদর্শন করে গেছেন এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন আম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এটি সফল হলে বাংলাদেশের আম রপ্তানিতে নতুন মাইলফলক যুক্ত হবে। এছাড়া রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুর থেকেও মানসম্পন্ন আম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে।

আম রপ্তানির জন্য বর্তমানে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আমকে পোকা ও রাসায়নিকমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। রাজশাহী ম্যাঙ্গো প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ারুল হক জানান, রপ্তানির জন্য নিয়ম মেনে আম ছোট থাকতেই ব্যাগ পরানো হয়। আম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিদেশে বাংলাদেশের আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু তারা সে তুলনায় রপ্তানি করতে পারছেন না। ফ্রান্স ও ইতালিতে শুধু বাংলাদেশি নয়, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা সহ অন্যান্য দেশের মানুষও বাংলাদেশের আম পছন্দ করেন। তবে আম বিদেশে পাঠানোর পথে পচন ধরে যাওয়ার ভয় থাকে, তাই পচন রোধে প্রাকৃতিক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন রপ্তানিকারকরা। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চীনের সঙ্গে আম রপ্তানির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বছর নওগাঁ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম চীনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, আমের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও নতুন বাজারের সংযোজন বাংলাদেশের আম খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল চাষিদেরই লাভবান করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনছে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সঠিক পরিচর্যা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারলে বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং এটি দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কৃষিপণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

পাঠকপ্রিয়