সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বোরোর বাম্পার ফলন সত্ত্বেও চালের দামে অস্বস্তি, টিসিবি বলছে দাম বেড়েছে ১৪%

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ সময় ধরে চাল কিনতে গিয়ে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে সরু চালের উচ্চমূল্য বেশি ভুগিয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের। ভোক্তারা আশায় ছিলেন, দেশের সর্বাধিক উৎপাদনশীল বোরো মৌসুমে নতুন চাল বাজারে এলে দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে আসবে। কিন্তু ভরা মৌসুমেও সেই আশার প্রতিফলন ঘটেনি। নতুন চাল বাজারে আসার পর সরু চালের দাম কিছুটা কমলেও এখনও প্রতি কেজি কিনতে হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬ টাকা দরে, যা দেশের বেশিরভাগ সাধারণ ক্রেতারই নাগালের বাইরে। শুধু সরু চালই নয়, বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত মাঝারি চালের দামও আগের মতোই চড়া রয়েছে। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য মোটা চালও কিনতে হচ্ছে চড়া দামে।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বোরো মৌসুম হচ্ছে ধানের সর্বাধিক উৎপাদনশীল মৌসুম, কেননা দেশের মোট চাল উৎপাদনের সিংহভাগ আসে এই সময় থেকেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এবার আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় বোরোর ফলন অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে। কৃষক নির্বিঘ্নে তাদের সোনালী ফসল ঘরে তুলছেন। ইতোমধ্যে সারাদেশে বোরো আবাদি জমির ৭২ শতাংশের বেশি ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে। ফলন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে, এমনকি তা ছাড়িয়েও যেতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বোরো মৌসুমের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এবার সারাদেশে ৫০ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে এবং চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন। ইতোমধ্যে ৭২ দশমিক ২ শতাংশ ধান কাটার পর প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৪ টন। অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক (সম্প্রসারণ ও কো-অর্ডিনেশন) ড. মো. আব্দুল আজিজ জানিয়েছেন, এবার আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূলে ছিল, ফলনও খুব ভালো হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে তেমন প্রভাব পড়বে না এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে, যা প্রত্যাশার অধিকও হতে পারে।

বাজারে নতুন বোরো চাল উঠেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, নতুন চাল আসায় দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। খুচরা বাজারে সরু চাল হিসেবে পরিচিত মিনিকেটের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত কমেছে। আগে যে মিনিকেট ৮৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৭৬ টাকায়। তবে পুরনো চাল এখনও ৮০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মাঝারি চাল ৬২ থেকে ৬৪ টাকা এবং মোটা চাল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে বাজার করতে আসা ক্রেতারা বলছেন, দাম কমার পরও সরু চালের বর্তমান মূল্য অনেক বেশি। ৭৫-৭৬ টাকা কেজি দরে চাল কেনা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। মালিবাগ বাজারে চাল কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক বলেন, “এটাকে ‘কমা’ বলে না। এক সময় ৬৪-৬৬ টাকা বিক্রি হওয়া চালের দাম ধাপে ধাপে বেড়ে ৮৮ টাকা হয়েছিল। সেখান থেকে কমে এখন ৭৫-৭৬ টাকা হয়েছে। এই দামেও কেনা কঠিন।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিকল্প হিসেবে যে মাঝারি চাল খাবেন, সেটার কেজিও এখন ৬৪ টাকা।

বাজার সংশ্লিষ্টরাও একমত পোষণ করে বলছেন, সাধারণত বোরো মৌসুমে ফলন ভালো হলে চালের দাম কমে আসে এবং বাজারে অনেকটা স্বস্তি ফেরে। কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও সরু চালের দাম চড়া। মাঝারি ও মোটা চালের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় চালের দাম এখনও বেশ খানিকটা বেশি।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনও বলছে চালের দামের ঊর্ধ্বগতির কথা। টিসিবি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে সরু চালের দাম ১৪ শতাংশ বেশি রয়েছে। মাঝারি চালের দাম বেশি রয়েছে ১২ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেশি রয়েছে ৩ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারের কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতা মোশাররফ হোসেন ও মো. জনি জানান, বোরো মৌসুমে ফলন ভালো হলে চালের বাজারে স্বস্তি থাকার কথা। তবে তাদের মতে, বাজারে চালের দাম কমা বা বাড়াটা ফলনের ওপর যতটা নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে মিল মালিকদের ওপর। মিলগুলো যে দামে চাল বাজারে ছাড়ে, সেই দামেই তাদের কিনতে ও বিক্রি করতে হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরু চালের দাম অত্যাধিক বাড়ার পর যেটুকু কমেছে, তাও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তাদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বড় ব্যবসায়ী এবং মিল মালিকরা এখনও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে ভোক্তারা চালের যৌক্তিক দাম পাচ্ছেন না।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দাম কমার পর সরু চাল যে দামে বিক্রি হচ্ছে (৭৫-৭৬ টাকা), সেটাকে কোনোভাবেই সহনীয় বলা যায় না। তার মতে, সরু চালের দাম কোনোভাবেই ৬২ থেকে ৬৪ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। মাঝারি ও মোটা চালের দামও অনেক চড়া বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ৫৫-৫৬ টাকায় মোটা চাল কিনে খেতে নিম্ন আয়ের মানুষের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের আয় বাড়েনি, ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তাই চালের মতো অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা জরুরি।

ক্যাব সহসভাপতি মনে করেন, অন্যান্য পণ্যের বাজারের তুলনায় ধান-চালের বাজারে নজরদারির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, চালের বাজার এখনও বড় ‘খেলোয়াড়দের’ কবজায় রয়ে গেছে এবং বড় মিল ও করপোরেটদের আধিপত্য কমেনি। ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও, এমনকি বিদেশ থেকে চাল আমদানি করার পরও চালের দাম এখনও অনেক চড়া থাকে, যা প্রমাণ করে বাজার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলছে না।

এসএম নাজের হোসাইন আরও বলেন, ধানের দাম বেশি পেলে কৃষকরা লাভবান হন, এটা ঠিক আছে। কিন্তু সেই অজুহাতে বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তিনি জোর দাবি জানান, মিলগুলোতে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। মিলগুলো কত দামে ধান কিনছে, কত মজুদ করছে এবং কত দামে বাজারে চাল ছাড়ছে – এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম অতিরিক্ত বাড়িয়ে অল্প সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিতে পারবে না এবং ভোক্তারা ন্যায্য দামে চাল কিনতে পারবেন।

বোরোর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতি বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উৎপাদন ভালো হওয়ার পরও কেন ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছেন না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় চালের উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।

পাঠকপ্রিয়