মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

মুরগির বিশ্বজয়: বুনো পাখি থেকে যেভাবে আধুনিক থালায়

তরিকুল হাসান

আজ থেকে প্রায় আট হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃষ্টিস্নাত অরণ্যে ঘুরে বেড়াত ‘রেড জঙ্গলফাউল’ নামের এক বুনো পাখি। কে জানত, এই পাখিটিই একদিন মানুষের রান্নাঘর থেকে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করবে! থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সেই গল্পই বলে, যেখানে মানুষ প্রথম এই বুনো পাখিকে পোষ মানিয়েছিল – শুরুতে হয়তো শুধু ডিমের জন্য, পরে তার মাংসের স্বাদও মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করে।

প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক যুগ, মুরগির এই যাত্রা বর্ণাঢ্য। চীনে এটি সম্রাটের খাদ্যতালিকায় রাজকীয় মর্যাদা পায়, ভারতে হয়ে ওঠে বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের অংশ। মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে মুরগি যখন ইউরোপের মাটিতে পা রাখে, গ্রিকরা তার লড়াইকে খেলায় পরিণত করে, আর রোমানদের কাছে এটি হয়ে ওঠে রাজকীয় ভোজের অন্যতম আকর্ষণ। তবে মধ্যযুগ পর্যন্ত মুরগি ছিল মূলত অভিজাত আর সম্পদশালী পরিবারের খাবার। সাধারণ কৃষকের কাছে মুরগি পালন ছিল সীমিত, কারণ তখনকার দেশি মুরগি খুব বেশি ডিম দিত না, মাংসের পরিমাণও ছিল কম।

বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় মুরগির নবজন্ম

ঊনবিংশ শতাব্দীতে চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব প্রাণী প্রজননে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে প্রাণীর কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি বাড়ানো সম্ভব। বিশ শতকের শুরুতে আমেরিকা ও ইউরোপের বিজ্ঞানীরা মুরগির জাত উন্নয়নের জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তাঁরা দেখেন, কিছু মুরগি অন্যদের চেয়ে বেশি ডিম দেয়, কিছু আবার দ্রুত বাড়ে। এই পর্যবেক্ষণই জন্ম দেয় ‘সিলেক্টিভ ব্রিডিং’ বা নির্বাচিত প্রজননের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে খাদ্যঘাটতি ও অপুষ্টি প্রকট আকার ধারণ করে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত উৎপাদনশীল প্রাণিসম্পদের চাহিদা বাড়ে। ১৯২০-৩০ সালের দিকে আমেরিকার কৃষিবিদ হেনরি ওয়ালেস প্রথম হাইব্রিড মুরগির ধারণা নিয়ে আসেন। তিনি বিভিন্ন জাতের মুরগির সংকরায়ণের মাধ্যমে বছরে ৩০০টিরও বেশি ডিম দিতে সক্ষম আশ্চর্য রকমের উৎপাদনশীল মুরগি তৈরি করেন। ওয়ালেসের হাত ধরেই ১৯৩৬ সালে যাত্রা শুরু করে ‘হাই-লাইন ইন্টারন্যাশনাল’ – বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হাইব্রিড মুরগি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রযুক্তি আজ ১২০টিরও বেশি দেশে সমাদৃত।

এরপর একে একে ডেক্যালব পোলট্রি রিসার্চ (১৯৪৪), কানাডার শেভার পোলট্রি ব্রিডিং ফার্মস (১৯৫০) এবং জার্মানির লোহম্যান টিয়ারজুখট (১৯৬০) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ডেক্যালব হোয়াইট, শেভার স্টারক্রস ও লোহম্যান ব্রাউনের মতো বিশ্ববিখ্যাত হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করে। মুরগি পালন তখন সাধারণ কৃষিকাজ থেকে এক বিশাল শিল্পে রূপ নিতে শুরু করে।

হাইব্রিড মুরগির বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তি শুধু আমেরিকা বা ইউরোপে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হাইব্রিড মুরগির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। থাইল্যান্ডের সিপি গ্রুপ এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ত করে থাইল্যান্ডকে বিশ্বের শীর্ষ মুরগি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করে। ভারতে ভেনকি’স এবং আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও একই রকম সাফল্য আসে, যা লাখ লাখ পরিবারের আয়ের উৎস তৈরি করে। ব্রাজিল আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুরগি রপ্তানিকারক দেশ।

ফাস্ট ফুড শিল্পের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার পেছনেও রয়েছে হাইব্রিড মুরগির বিশাল অবদান। কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’সের মতো বিশ্বখ্যাত চেইন শপগুলো তাদের ফ্রায়েড চিকেন বা নাগেটস তৈরির জন্য বিশ্বব্যাপী একই স্বাদ ও আকৃতির যে মুরগি ব্যবহার করে, তার পুরোটাই আসে এই হাইব্রিড জাত থেকে।

পুষ্টিতে বিপ্লব ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

হাইব্রিড মুরগির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে ডিম খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রোটিনের প্রধান উৎস ছিল তুলনামূলক ব্যয়বহুল গরু বা ছাগলের মাংস, সেখানে চিকেন ও ডিম আজ সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ইউএস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে বিশ্বে মাথাপিছু ডিম ভোগের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০টি, যা আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০টিতে। ১৯৬০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে মুরগির মাংসের ব্যবহার বেড়েছে পাঁচ গুণ। একসময় যে ডিম ছিল বিলাসদ্রব্য, আজ তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে।

সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

হাইব্রিড মুরগির এই অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও রয়েছে। ফ্যাক্টরি ফার্মিং পদ্ধতিতে মুরগিগুলোকে অতি ঘনিষ্ঠ ও অপ্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা হয়, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং অমানবিক বলে বিবেচিত হয়। জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় অ্যাভিয়ান ফ্লুর মতো রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলোও উদ্বেগের কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টেকসই, নৈতিক ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি নিশ্চিত করা না গেলে এই শিল্প ভবিষ্যতে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

একসময়ের বনের পাখি মুরগি আজ বৈশ্বিক খাদ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। হাজার বছরের এই যাত্রায় মুরগি যেমন মানুষের প্রয়োজনে নিজেকে বদলে নিয়েছে, তেমনি মানুষও তাকে ব্যবহার করেছে নিজের চাহিদা অনুযায়ী। এই সহাবস্থান আগামী দিনে আরও টেকসই ও মানবিক হবে, এটাই প্রত্যাশা।

পাঠকপ্রিয়