মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

রেলের রেস্ট হাউস ব্যবহারে অনিয়ম, ‘সৌন্দর্যবর্ধনে’ উচ্ছেদের মুখে ৩ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের কদমতলী ফ্রান্সিস রোডে রেলওয়ের ‘গ্রামীণ রেস্ট হাউস’ নিয়ম ভেঙে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদী আবাস বা ডরমিটরি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই রেস্ট হাউসের ‘সৌন্দর্যবর্ধনের’ নামে পাশের তিনটি সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে রেলওয়ে বছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা রাজস্ব পায়। এই ঘটনায় একদিকে যেমন রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তেমনি সরকারি সম্পদের অপচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী গ্রামীণ রেস্ট হাউসটি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বিশ্রামের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রেলের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে থাকছেন এবং তাদের জন্য রেললাইনের কাজে নিয়োজিত একজন ওয়েম্যানকে (হাফিজুর রহমান) রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বিধি পরিপন্থী।

সম্প্রতি এই রেস্ট হাউস এলাকার ‘সৌন্দর্য বৃদ্ধি’ করে কর্মকর্তাদের অবসরে কফি পানের পরিবেশ তৈরির জন্য পাশের ই/৮ নম্বর বাংলোটি (যা তিনটি মেডিক্যাল পুলভুক্ত কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে) ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে এই কোয়ার্টারগুলোতে সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালের সিস্টার ইনচার্জ সরমিনা জাহান ও রীতা খান এবং ফার্মাসিস্ট মো. নাছির উদ্দিন তাদের পরিবারসহ বসবাস করছেন। এই তিন কর্মচারী প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ পরিশোধ করেন।

ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, পূর্বে বসবাসের অনুপযোগী থাকা বাসাগুলো তারা নিজেদের খরচে সংস্কার করে বসবাস করছেন। তারা এই উচ্ছেদ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। সিস্টার ইনচার্জ সরমিনা জাহান বলেন, “আমরা নিজেদের খরচে বাসা সংস্কার করেছি। এখানে থাকায় জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছানো যায়। আমাদের সরিয়ে দিলে শুধু সন্তানদের শিক্ষাজীবনই নয়, কর্মঘণ্টার বাইরের জরুরি দায়িত্ব পালনেও সমস্যা হবে।”

গত ১৪ মে রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, এম রিয়াসাদ ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তার (সিএমও) কাছে ওই তিন কর্মচারীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে রেস্ট হাউসের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য পাশের কোয়ার্টারগুলোর ‘রিমডেলিং’ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রামীণ রেস্ট হাউসে এভাবে থাকার কোনো বিধান না থাকলেও এবং অনেকের নামে ঢাকায় বাসা বরাদ্দ থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে এটি ব্যবহার করছেন এবং যথাযথ ভাড়াও পরিশোধ করছেন না।

এ বিষয়ে রেলওয়ের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ইবনে সফি আব্দুল আহাদ চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) এবিএম কামরুজ্জামান দাবি করেন, “রেস্ট হাউসটি ডরমিটরি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিন কর্মচারীকে অন্য বাসায় সরিয়ে নেওয়া হবে।” তিনি রেস্ট হাউসে থাকার জন্য ৬০ শতাংশ ভাড়া দেন বলেও দাবি করেন, যদিও রেলওয়ের হিসাব শাখায় এর কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতিতে, সরকারি সম্পদ ও জনবলের অপব্যবহার এবং রাজস্ব আয়ের কোয়ার্টার ভেঙে অপ্রয়োজনীয় ‘সৌন্দর্যবর্ধনের’ এই উদ্যোগ নিয়ে রেলওয়ের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।

পাঠকপ্রিয়