গত সাত অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও, এই সময়ের মধ্যে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার বিনিয়োগ করেছে তার মাত্র ৪ শতাংশেরও কম। আমদানির ওপর এই অতি নির্ভরশীলতা ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মতো সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটের মুখে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য হওয়ায় এবং এই প্রণালী প্রধান পথ হওয়ায় জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের মাত্র ২০-২৫ শতাংশ এলএনজি দিয়ে মেটানো হলেও এর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দুই দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানি মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো ৫৯টি কূপ খনন করেছে, যার মধ্যে অনুসন্ধানমূলক কূপগুলোর ৫০ শতাংশেই গ্যাস পাওয়া গেছে এবং এই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে ৩৮৭ শতাংশ মুনাফা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, “প্রতি বছর সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করছে, যার নানা ঝুঁকি রয়েছে। আমাদের উচিত স্থানীয় গ্যাসে বিনিয়োগ বাড়িয়ে গ্যাসের মজুদ প্রাপ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আগামীতেও বাড়তে থাকবে, তাই আমদানির উৎসের ভবিষ্যৎ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।”
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভূতত্ত্ববিদ মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, “স্থলভাগে বাপেক্সের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানি এনে বৃহৎ আকারে অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু আইনি জটিলতায় তা করা হয়নি। প্রায় দুই দশক দেশে পাহাড়ে, স্থলভাগে এক্সপ্লোরেশনের কোনো কাজই হয়নি।”
তবে জ্বালানি বিভাগ বলছে, তারা সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপ, কূপ খননসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে গত অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় কমাতে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরালো করতে পিএসসি হালনাগাদ করা হয়েছে এবং পার্বত্য এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সরকার আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৮টি গ্যাসকূপ খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন করে আরও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।