সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ওঝার ভুলে বাড়ছে মৃত্যু: অ্যান্টিভেনম থাকলেও হাসপাতালে যায় না রোগী

বিষাক্ত ছোবল: সাপের কামড়ে দিনে ২০ মৃত্যু, নীরব মহামারিতে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিদিন গড়ে ২০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে সাপের বিষাক্ত ছোবল। বছরে এই সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজারের বেশি। জনসংখ্যার চাপে বন ও কৃষিজমি ধ্বংস হওয়ায় সাপের আশ্রয়স্থল কমছে, বাড়ছে মানুষ ও সাপের সংঘাত। আর এই সংঘাতে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই মৃত্যুর মিছিলের পেছনে সাপের বিষের চেয়েও বড় ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে ওঝা- বৈদ্যের ওপর অন্ধবিশ্বাস এবং চিকিৎসার অব্যবস্থাপনা।

সংকটের কেন্দ্রে বিশ্বাস আর অ্যান্টিভেনম

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৯০ শতাংশ রোগীকেই বাঁচানো সম্ভব, যদি তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমে নেওয়া হয় ওঝা বা বৈদ্যের কাছে। এই কুসংস্কারের পেছনে মূল্যবান সময় নষ্ট করায় বহু রোগীর জীবনপ্রদীপ নিভে যায় পথেই।

অন্যদিকে, যারা হাসপাতালে পৌঁছান, তারাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না। আবার থাকলেও, অনেক চিকিৎসক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে তা প্রয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ জানান, “আমাদের দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমগুলো শত বছরের পুরোনো প্রযুক্তিতে তৈরি এবং দক্ষিণ ভারতের চারটি সাপ থেকে সংগৃহীত বিষে তৈরি হওয়ায় এটি সব ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পরও ২০ থেকে ২২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়।”

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেনের দাবি, দেশে অ্যান্টিভেনমের কোনো সংকট নেই। তিনি বলেন, “বছরে ৭০ হাজার ডোজ অ্যান্টিভেনমের প্রয়োজন হলেও বাস্তবে ২৫ হাজারের বেশি ব্যবহৃত হয় না, কারণ মানুষ চিকিৎসকের কাছে আসে না।”

ফিরে আসা ঘাতক: রাসেলস ভাইপার

বাংলাদেশের ৯০ প্রজাতির সাপের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ বিষধর। এর মধ্যে অন্যতম গোখরা, কেউটে, শঙ্খচূড়, শঙ্খিনী এবং সবচেয়ে বিষাক্ত রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া। ১০০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই সাপ গত এক দশকে আবার ফিরে এসেছে এবং বর্তমানে দেশের ২৭টি জেলায় এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের মতো এলাকাগুলো এখন রাসেলস ভাইপারের জন্য ‘রেড জোন’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে এর দংশনে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

কখন বাড়ে সাপের উপদ্রব?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে (জুন-আগস্ট) এবং সাপের প্রজনন মৌসুম অক্টোবরে ছোবলের ঘটনা বেড়ে যায়। এই সময়ে সবাইকে অনেক বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বিষধর সাপের ছোবলের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—দংশিত স্থান ফুলে যাওয়া, রক্তপাত হওয়া, রোগীর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়া এবং প্রস্রাব কমে যাওয়া বা কালো হয়ে যাওয়া।

চিকিৎসকরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, সাপে কাটা ব্যক্তিকে কোনো রকম ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের পেছনে সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ও মানসম্মত অ্যান্টিভেনমের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই নীরব মহামারি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

পাঠকপ্রিয়