সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আলোচিত ‘শিবির নাছির’-এর নতুন ইনিংস, ৬০ বছরে বিয়ের পিঁড়িতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময় যাঁর নাম শুনলে অনেকেই আঁতকে উঠতেন, সেই নাছির উদ্দিন চৌধুরী ওরফে ‘শিবির নাছির’ এখন সংসারী। খুন, অপহরণ, অস্ত্র আর চাঁদাবাজির মতো ৩৬টি মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে জীবনের ২৬টি বসন্ত কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। অবশেষে গত বছর মুক্তি পেয়েছিলেন জামিনে। আর মুক্তির ১১ মাসের মাথায়, ৬০ বছর বয়সে এসে শুরু করলেন জীবনের নতুন এক অধ্যায়। গত বৃহস্পতিবার ১৫ লাখ টাকা দেনমোহরে হাটহাজারীর কুলসুমা বেগমকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে আবারও সংবাদের শিরোনাম হলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করছেন, কেউবা জানাচ্ছেন শুভকামনা। কিন্তু যে ব্যক্তির জীবনটাই সিনেমার গল্পের মতো, তাঁর এই নতুন পথচলা কৌতূহল জাগিয়েছে সবার মনে।

কে এই ‘শিবির নাছির’?

নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম কাঁপানো এক নাম নাছির উদ্দিন চৌধুরী। র‍্যাব-পুলিশের খাতায় তিনি ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁর নামের সাথে জুড়ে যায় ‘শিবির’ শব্দটি। যদিও ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরের (উত্তর) সভাপতি তানজীর হোসেন দাবি করেন, নাছির কখনো শিবিরের সাংগঠনিক সদস্য ছিলেন না। তাঁর কথায়, “মানুষের মুখে মুখে তাঁর নামের সাথে শিবির কথাটি জুড়ে গেছে। তিনি হয়তো শিবিরের ভালো কাজকে সমর্থন করতেন, কিন্তু তিনি কখনো শিবিরের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।”

৩৬ মামলার খড়গ এবং অবিশ্বাস্য মুক্তি

নাছিরের বিরুদ্ধে থাকা ৩৬টি মামলার তালিকা ছিল বেশ লম্বা—জোড়া খুন থেকে শুরু করে অপহরণ, অস্ত্র আইন ও চাঁদাবাজি—বাদ ছিল না কিছুই। তবে অবিশ্বাস্যভাবে, সময়ের সাথে সাথে ৩১টি মামলা থেকেই তিনি খালাস পান। আদালত সূত্র জানায়, রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন দাবি করে তাঁর আইনজীবী মনজুর আহমেদ আনসারী লড়ে গেছেন বছরের পর বছর।

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জমির উদ্দিন হত্যা মামলা, নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি হত্যা মামলা এবং হাটহাজারীর চাঞ্চল্যকর তিন খুনের মতো বড় বড় মামলাতেও তিনি বেকসুর খালাস পান। দুটি মামলায় সাজা হলেও, তাঁর দীর্ঘ ২৬ বছরের কারাভোগের কারণে সেই সাজা আগেই তামাদি হয়ে যায়। অবশেষে, শেষ মামলাটিতেও গত বছরের ১১ আগস্ট জামিন পেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি। ১৯৯৮ সালের ৯ এপ্রিল কারাগারে প্রবেশ করা নাছির দীর্ঘ কারাভোগের পর যখন বের হন, তখন সময় গড়িয়ে গেছে ২৬ বছর।

নতুন জীবনের স্বপ্ন

কারাগারের চার দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসে নাছির এখন সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর বড় বোন লিলি আক্তার জানান, “আমরা মেয়েপক্ষ থেকে কোনো যৌতুক নিইনি। আমার ভাই এখন সংসারী হয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে চায়।”

সবার কাছে দোয়া চেয়ে নাছির নিজেও বলেন, “ব্যবসা করে সংসার চালাতে চাই। বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে কাটাতে চাই।”

একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই ব্যক্তি কি পারবেন তাঁর অতীতকে পেছনে ফেলে শান্তির জীবন খুঁজে নিতে? একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্বামী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে ‘শিবির নাছির’-এর জীবনের এই নতুন মোড় নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এক দীর্ঘ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পাঠকপ্রিয়