সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

রাউজান এখন আতঙ্কের জনপদ: মাটি-বালুর ভাগাভাগিতে ঝরছে রক্ত, পুড়ছে ঘর

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

পাহাড়ের মাটি, নদীর বালু আর রাজনৈতিক আধিপত্য—এই তিনের দখল নিয়ে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা পরিণত হয়েছে এক রক্তাক্ত জনপদে। গত ১১ মাসে এখানে খুন হয়েছেন ১৫ জন, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে অর্ধশতাধিকবার, আর অপহরণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১২ জন। নেপথ্যে রয়েছে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যকার এক ভয়াবহ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যার জেরে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অতিষ্ঠ প্রশাসন এখন রাউজানকে ভাগ করে নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।

জ্বলে উঠেছে দ্বন্দ্বের আগুন

রাউজানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুই গ্রুপের লাগাতার সংঘাতের জেরে গত মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে দুটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিলুপ্ত করা হয় গোলাম আকবর খোন্দকারের নেতৃত্বাধীন উত্তর জেলা বিএনপির পুরো কমিটি এবং একইসাথে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ স্থগিত করা হয় আরেক প্রভাবশালী নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরীর।

কিন্তু দলীয় এই কঠোর পদক্ষেপও দমাতে পারেনি দুই পক্ষকে। গতকাল বুধবারও তারা একে অপরের ওপর দোষারোপ করে শক্তি প্রদর্শন করেছে। রাউজানে গোলাম আকবর খোন্দকারকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিক্ষোভ করেছে গিয়াসের অনুসারীরা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শহরে সংবাদ সম্মেলন করে গিয়াস কাদেরকে ‘চাঁদাবাজদের হোতা’ আখ্যা দিয়ে তাঁর অনুসারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে খোন্দকার গ্রুপ।

নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, “গিয়াস কাদেরের সমর্থকরা রাউজানে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির হাট বসিয়েছে। গত ১৭ বছর তারা এলাকায় ছিল না, এখন ফসলি জমির মাটি, নদীর বালু আর ইটভাটা দখল করে রামরাজত্ব চালাচ্ছে। আমি বাধা দেওয়ায় তারা আমাকে প্রাণে মারতে গুলি পর্যন্ত করেছে।”

অন্যদিকে, গিয়াস কাদের চৌধুরীও এর আগে পাল্টা অভিযোগে বলেছিলেন, “রাউজানে একক আধিপত্য ধরে রাখতে গোলাম আকবর খোন্দকারই সন্ত্রাসীদের ইন্ধন দিচ্ছেন। সব সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ তারই অনুসারী।”

মূল বিরোধ: মাটি আর বালুর টাকার ভাগ

রাউজানের ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টিতেই এই দুই নেতার পৃথক বলয় রয়েছে। আর এই ইউনিয়নগুলোতেই রয়েছে ইটভাটা, পাহাড় আর নদী। মূলত পাহাড়ের মাটি কাটা এবং হালদা ও কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়েই সংঘাতের শুরু।

* মাটির জন্য তিন খুন: মাটি কাটার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন তিন যুবদলকর্মী—কমর উদ্দিন জিতু, আবদুল্লাহ মানিক এবং মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এদের মধ্যে মানিককে ভাত খাওয়ার সময় মুখে বন্দুক ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়।

* বালুমহালের দখল: কর্ণফুলী ও হালদা নদীর অন্তত ১৫টি পয়েন্ট থেকে সন্ত্রাসীরা অবৈধভাবে বালু তুলছে, যা নিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে হাঙ্গামা।

সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীরাই মূল শিকার

নেতাদের এই ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীরা। চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসী নুরুল আমীনকে মারধর করে দেশছাড়া করা হয়েছে। আরেক প্রবাসী আজম খান এবং শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে চাঁদার জন্য প্রাণই দিতে হয়েছে। সর্বশেষ খুন হওয়া যুবদল নেতা মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার বলেন, “শিশুকন্যার সামনেই আমার স্বামীকে খুন করা হয়। আমি খুনিদের শনাক্ত করলেও পুলিশ তাদের ধরেনি।”

প্রশাসনের অসহায়ত্ব

অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে অপরাধ করছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাউজানের ইউএনও জিসান বিন মাজেদ বলেন, “অপরাধীরা সব সময় রাজনৈতিক ছায়া খোঁজে। জনগণকে শান্তি দিতে দক্ষিণ রাউজানে নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছি।”

রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার কণ্ঠেও ঝরল অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই পরিকল্পিত। রাজনৈতিক নেতারা যদি নিজের দলের কর্মীদের সামলাতে না পারেন, তবে পুলিশের পক্ষে একা অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়।”

নেতারা যখন সংবাদ সম্মেলনে একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত, তখন রাউজানের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখছে আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই—এই রক্তক্ষয়ী খেলার শেষ কোথায়?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

রাউজান এখন আতঙ্কের জনপদ: মাটি-বালুর ভাগাভাগিতে ঝরছে রক্ত, পুড়ছে ঘর

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ জুলাই ২০২৫, ০৯:১৪

পাহাড়ের মাটি, নদীর বালু আর রাজনৈতিক আধিপত্য—এই তিনের দখল নিয়ে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা পরিণত হয়েছে এক রক্তাক্ত জনপদে। গত ১১ মাসে এখানে খুন হয়েছেন ১৫ জন, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে অর্ধশতাধিকবার, আর অপহরণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১২ জন। নেপথ্যে রয়েছে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যকার এক ভয়াবহ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যার জেরে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অতিষ্ঠ প্রশাসন এখন রাউজানকে ভাগ করে নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।

জ্বলে উঠেছে দ্বন্দ্বের আগুন

রাউজানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুই গ্রুপের লাগাতার সংঘাতের জেরে গত মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে দুটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিলুপ্ত করা হয় গোলাম আকবর খোন্দকারের নেতৃত্বাধীন উত্তর জেলা বিএনপির পুরো কমিটি এবং একইসাথে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ স্থগিত করা হয় আরেক প্রভাবশালী নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরীর।

কিন্তু দলীয় এই কঠোর পদক্ষেপও দমাতে পারেনি দুই পক্ষকে। গতকাল বুধবারও তারা একে অপরের ওপর দোষারোপ করে শক্তি প্রদর্শন করেছে। রাউজানে গোলাম আকবর খোন্দকারকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিক্ষোভ করেছে গিয়াসের অনুসারীরা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শহরে সংবাদ সম্মেলন করে গিয়াস কাদেরকে ‘চাঁদাবাজদের হোতা’ আখ্যা দিয়ে তাঁর অনুসারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে খোন্দকার গ্রুপ।

নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, “গিয়াস কাদেরের সমর্থকরা রাউজানে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির হাট বসিয়েছে। গত ১৭ বছর তারা এলাকায় ছিল না, এখন ফসলি জমির মাটি, নদীর বালু আর ইটভাটা দখল করে রামরাজত্ব চালাচ্ছে। আমি বাধা দেওয়ায় তারা আমাকে প্রাণে মারতে গুলি পর্যন্ত করেছে।”

অন্যদিকে, গিয়াস কাদের চৌধুরীও এর আগে পাল্টা অভিযোগে বলেছিলেন, “রাউজানে একক আধিপত্য ধরে রাখতে গোলাম আকবর খোন্দকারই সন্ত্রাসীদের ইন্ধন দিচ্ছেন। সব সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ তারই অনুসারী।”

মূল বিরোধ: মাটি আর বালুর টাকার ভাগ

রাউজানের ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টিতেই এই দুই নেতার পৃথক বলয় রয়েছে। আর এই ইউনিয়নগুলোতেই রয়েছে ইটভাটা, পাহাড় আর নদী। মূলত পাহাড়ের মাটি কাটা এবং হালদা ও কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়েই সংঘাতের শুরু।

* মাটির জন্য তিন খুন: মাটি কাটার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন তিন যুবদলকর্মী—কমর উদ্দিন জিতু, আবদুল্লাহ মানিক এবং মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এদের মধ্যে মানিককে ভাত খাওয়ার সময় মুখে বন্দুক ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়।

* বালুমহালের দখল: কর্ণফুলী ও হালদা নদীর অন্তত ১৫টি পয়েন্ট থেকে সন্ত্রাসীরা অবৈধভাবে বালু তুলছে, যা নিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে হাঙ্গামা।

সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীরাই মূল শিকার

নেতাদের এই ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীরা। চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসী নুরুল আমীনকে মারধর করে দেশছাড়া করা হয়েছে। আরেক প্রবাসী আজম খান এবং শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে চাঁদার জন্য প্রাণই দিতে হয়েছে। সর্বশেষ খুন হওয়া যুবদল নেতা মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার বলেন, “শিশুকন্যার সামনেই আমার স্বামীকে খুন করা হয়। আমি খুনিদের শনাক্ত করলেও পুলিশ তাদের ধরেনি।”

প্রশাসনের অসহায়ত্ব

অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে অপরাধ করছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাউজানের ইউএনও জিসান বিন মাজেদ বলেন, “অপরাধীরা সব সময় রাজনৈতিক ছায়া খোঁজে। জনগণকে শান্তি দিতে দক্ষিণ রাউজানে নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছি।”

রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার কণ্ঠেও ঝরল অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই পরিকল্পিত। রাজনৈতিক নেতারা যদি নিজের দলের কর্মীদের সামলাতে না পারেন, তবে পুলিশের পক্ষে একা অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়।”

নেতারা যখন সংবাদ সম্মেলনে একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত, তখন রাউজানের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখছে আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই—এই রক্তক্ষয়ী খেলার শেষ কোথায়?