অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্না থামেনি। নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান অথবা দায়ীদের শাস্তির দাবিতে তাদের অপেক্ষা অব্যাহত রয়েছে। অনেকে এখনও নিখোঁজ, কেউ কেউ গোপন বন্দিদশা থেকে ফিরেছেন, আবার কারো কারো লাশ পাওয়া গেছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর গুমের ঘটনা তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বছরের ২৭ আগস্ট ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান কমিশন’ গঠন করা হয়।
কমিশন বর্তমানে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ১,৩৫০টি গুমের ঘটনা তদন্ত করছে, যার মধ্যে ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তির এখনও কোনো সন্ধান মেলেনি।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসকে (৩০ আগস্ট) সামনে রেখে শুক্রবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনায় নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কর্মী ইসমাইল হোসেন বাটেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতি বলেন, “আমি শুধু আমার স্বামীর সন্ধানটুকু জানতে চাই। আমি কাঁদতে চাই না, কিন্তু কেন আমাদের এখনও বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে?”
তিনি জানান, ২০১৯ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্য পরিচয়ে একদল লোক তার স্বামীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ।
ফিরে এলেন যারা, শোনালেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
আলোচনায় অনেকে তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ইলেকট্রিশিয়ান রহমতুল্লাহকে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট ধামরাইয়ের নিজ বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে যশোর সীমান্তে পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, “তুলে নেওয়ার পর তারা আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং নয় মাস ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাখে। পরে আমাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ‘অবৈধ প্রবেশের’ অভিযোগে আমি সাত মাস দমদম জেলে বন্দি ছিলাম।” এই অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
সরকারের উদ্যোগ ও নতুন আইন
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অধিকার নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রস্তাবিত ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর ২৪ ধারার অধীনে একটি তহবিল গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, “এই তহবিল থেকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে।” আইনটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
এর আগে গত ২৮ আগস্ট সরকার এই অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়, যেখানে এই অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ’-এ স্বাক্ষর করে।
কমিশনের বক্তব্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি
অনুষ্ঠানে অনুসন্ধান কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, “বাংলাদেশ থেকে ‘গুম’ শব্দটি মুছে ফেলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কমিশন কাজ করছে এবং আশা করছি ডিসেম্বরের মধ্যে অভিযোগগুলোর অবস্থা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পারব।”
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার, র্যাব বিলুপ্ত করা, ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিলের দাবি জানানো হয়।
অধিকারের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৭৪৫ জন গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ।