মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

উৎপাদনে বেসরকারি খাতের জয়জয়কার, সরকারি রাবার বাগান যেন ‘বৃদ্ধাশ্রম’

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সম্ভাবনাময় রাবার শিল্পে বাংলাদেশ যেন এগোতে পারছে না। একদিকে সরকারি বাগানগুলোর নাজুক দশায় প্রতি বছর গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার লোকসান, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফআইডিসি) অধীনস্থ বাগানগুলোর উৎপাদন ব্যক্তিগত খাতের তুলনায় যৎসামান্য হওয়ায় দেশের ‘সাদা সোনা’ হিসেবে পরিচিত এই খাতটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট রাবার উৎপাদনের ৭২ শতাংশই আসে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান থেকে। একরপ্রতি উৎপাদনেও সরকারি বাগানের চেয়ে বহুগুণে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি খাত। যেখানে খাগড়াছড়ি রাবার মালিক সমবায় সমিতির বাগানগুলো একরপ্রতি ১.৬২ টন রাবার উৎপাদন করে শীর্ষে রয়েছে, সেখানে বিএফআইডিসির বাগানগুলোর উৎপাদন মাত্র দশমিক ১৪৭ টন। এই বিশাল পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এর ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই সরকারি রাবার বাগানগুলোতে লোকসান হয়েছে ৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

সরকারি বাগানগুলোর এই বেহাল দশার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পুরনো গাছ এবং আধুনিক পদ্ধতির অভাব। বিএফআইডিসির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ জানান, “আমাদের বাগানগুলোর প্রায় ১০ লাখ গাছের জীবনচক্র (৩২ বছর) শেষ হয়ে গেছে। এসব গাছ থেকে উৎপাদন প্রায় বন্ধ। এছাড়া আমাদের কাছে উচ্চ উৎপাদনশীল হাইব্রিড গাছ নেই, যা বেসরকারি খাতের সাফল্যের অন্যতম কারণ।”

একদিকে লোকসান, অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতা—এই দ্বিমুখী চাপে পড়ছে দেশের অর্থনীতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রাবার ও রাবার শিট আমদানি ৩২ শতাংশ এবং আমদানি ব্যয় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। গত অর্থবছরে যেখানে ৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার রাবার আমদানি হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্তই আমদানি ব্যয় ১০৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। তবে এর মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে রপ্তানি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রাবার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৫ লাখ ডলারের বেশি, যা গত পুরো অর্থবছরের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।

যদিও সরকারি প্রতিবেদনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা লোকসানের কথা বলা হয়েছে, বিএফআইডিসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে ভিন্ন সুর শোনা গেছে। তিনি দাবি করেন, “আগে লোকসানে থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে আমরা লাভে এসেছি। অনিরীক্ষিত হিসাবে আমাদের প্রায় আড়াই কোটি টাকা লাভ থাকবে।” তবে চূড়ান্ত নিরীক্ষায় এই চিত্র বদলাতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন।

এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিএফআইডিসি চেয়ারম্যান জানান, শ্রীলঙ্কা থেকে উন্নত মানের ক্লোন আমদানির পাশাপাশি নতুন ১০ লাখ চারা লাগানোর একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও জানান, রাবার উৎপাদন বাড়াতে মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছে উন্নত ক্লোনের জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং একটি দেশ তাতে সাড়া দিয়েছে। একইসাথে রাবার শিল্পকে কেন্দ্র করে বনজ শিল্পের প্রসারে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজও চলছে।

সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নই এখন পারে রাবার খাতের এই লোকসানের বৃত্ত ভেঙে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে।

পাঠকপ্রিয়