সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যাচ্ছে কৃষি, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নতুন আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব, যেমন—অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যার কারণে বাংলাদেশের কৃষি খাত যখন মারাত্মক হুমকির মুখে, তখন আধুনিক প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে সংকট মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

চট্টগ্রামের কৃষক নবী হোসেনের মতো হাজারো কৃষক যখন অনিয়মিত বৃষ্টিতে ফসল হারিয়ে কৃষি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন মোহাম্মদ তারেক ও সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার মতো তরুণ উদ্যোক্তারা স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সফলতার মুখ দেখছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্ট সেচ থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত অ্যাপ এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ফসলের সঠিক ব্যবহারই পারে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করতে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কৃষক নবী হোসেন বলেন, “আগে বর্ষায় সময়মতো বৃষ্টি হতো, এখন বৃষ্টি কমে গেছে। গত বছর ঠিক সময়ে বৃষ্টির অভাবে আমরা ধান চাষই করতে পারিনি।” জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৫ শতাংশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম ফজলুল হক ভূঁইয়া।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তি আশার আলো দেখাচ্ছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তরুণ উদ্যোক্তা মোহাম্মদ তারেক আপেল কুল এবং বিভিন্ন জাতের ছাগল ও হাঁসের খামারে সৌরশক্তি চালিত ‘স্মার্ট সেচ’ ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন।

তিনি জানান, এই পদ্ধতিতে তিনি বছরে প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় করছেন। উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা টিপু কুমার নাথ বলেন, “এই প্রকল্পে সৌরশক্তি ব্যবহার হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পাইপের মাধ্যমে পানি যাওয়ায় অপচয়ও রোধ হচ্ছে।”

একইভাবে, রাঙ্গুনিয়ার কৃষক সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে মাল্টা চাষে সাফল্য পেয়েছেন। এই ব্যবস্থায় কম খরচে ও কম সময়ে গাছে পরিমিত পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, এই সাফল্য পাহাড়ী এলাকার অন্য কৃষকদেরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।

কৃষকদের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদর এবং পোকামাকড়ের তথ্য দ্রুত পৌঁছে দিতে ‘কৃষকের জানালা’ ও ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’-এর মতো ডিজিটাল অ্যাপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

‘আইফার্মার’-এর মতো স্টার্টআপগুলো স্যাটেলাইট ডেটা, সয়েল সেন্সর এবং ‘কাউডি’ নামক স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে লক্ষাধিক কৃষককে প্রযুক্তি-ভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরহাদ জুলফিকার বলেন, “আমাদের অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্য মূল্যে ও সহজে তাদের ফসল বিক্রি করতে পারছেন।”

খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ফসল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালে দেশে চালু হওয়া বিটি বেগুন ক্ষতিকর পোকা প্রতিরোধী হওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। তবে পরিবেশবাদী সংগঠন উবিনীগ-এর নির্বাহী পরিচালক জিএম ফসলের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি এবং দেশীয় জাতের ফসলের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর ব্যবহারে সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, “অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য প্রযুক্তির প্রাথমিক খরচ বহন করা কঠিন। পাশাপাশি, নিরক্ষরতা ও গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের অভাবও একটি বড় বাধা।”

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি প্রদান এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই প্রযুক্তির সুফল দেশের প্রতিটি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

পাঠকপ্রিয়