রাজধানী ঢাকার মিরপুরের তালতলা বস্তির বাসিন্দা আফসানা সুলতানার ঘরটি দৈর্ঘ্যে তেরো ফুট আর প্রস্থে সাত ফুট। জানালা বা ভেন্টিলেশনহীন এই টিনের ছাদের ঘরেই স্বামীসহ থাকেন তিনি। আফসানা বলেন, “শীতকাল কোনোভাবে কাটানো গেলেও গত কয়েক বছরের তীব্র গরমে এই ঘর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। মার্চ-এপ্রিল মাসে রাতে দরজা বন্ধ করলে দমবন্ধ লাগে।”
আফসানার এই বর্ণনা ঢাকার অসংখ্য বস্তিবাসীর জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। উন্মুক্ত মাঠ, পার্ক ও জলাভূমি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় ঢাকা শহর এক ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’ পরিণত হয়েছে, যা তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি করছে। এর সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন আফসানার মতো নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা, যাদের মধ্যে হিট স্ট্রোকসহ নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন জানান, গত তিন বছর ধরেই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০২৪ সালের ২৯ মার্চ থেকে ২ মে পর্যন্ত দেশে টানা ৩৫ দিন তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়, যখন তাপমাত্রা ৪৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা একটি অপরিকল্পিত শহর। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার নিম্ন আয়ের আবাসনগুলো অস্বাস্থ্যকর ও অবহেলিত। কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য শহরে যে পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান থাকা দরকার, তা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।”
এই তীব্র গরমের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো হিট স্ট্রোক। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে গেলে হিট স্ট্রোক হয়, যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং এতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের তাপপ্রবাহে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. মিজানুর রহমান জানান, এই পরিসংখ্যান শুধু সরকারি হাসপাতালের, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্য যোগ করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে নারী ও শিশুরা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভবতী মায়েদের অপরিণত ও কম ওজনের শিশু জন্মদান এবং মৃত সন্তান প্রসবের হার বেড়েছে।
নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, “শিশুরা দূষিত বাতাস, শব্দ দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক রোবেদ আমিন জানান, স্বাস্থ্যকর্মীদের হিট স্ট্রোক শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সম্প্রতি নতুন নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু নির্দেশিকা নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ এবং সবুজায়ন বৃদ্ধির মতো সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ঢাকার লাখ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে না।