সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ঢাকায় প্রতিদিন ২ হাজার নতুন মুখ, ৭০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯৭৩ সালে মেঘনার ভাঙনে ভোলার বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেলে দুই বছরের শিশু নীলুফার বেগম মায়ের হাত ধরে ঢাকায় এসেছিলেন। ৫১ বছর পর, রাজধানীর কল্যাণপুর বস্তির একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে তিনি তার জীবনযুদ্ধের গল্প বলছিলেন—যে গল্প শুধু তার একার নয়, বাংলাদেশের লাখো জলবায়ু উদ্বাস্তুর প্রতিচ্ছবি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে, যাদের ৭০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। নীলুফারের মতো এই মানুষেরা স্থায়ী উন্নয়নের অভাবে বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক অন্তহীন সংগ্রামে লিপ্ত।

নীলুফার বেগম বলেন, “ঢাকায় এসে খাবারের জন্য অনেক কষ্ট করেছি। মাত্র সাত বছর বয়সে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করি। নয় বছর বয়সে ইট ভাঙার কাজ করার সময় হাতুড়ির আঘাতে হাত থেঁতলে যায়।” শৈশবেই অপহরণ ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন তিনি।

তার জীবন সংগ্রামের সাক্ষী ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা, যখন আশ্রয়কেন্দ্রে তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়, এবং তার পরের বছর বস্তিতে লাগা আগুন, যা তার সর্বস্ব পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তিনি বলেন, “আগুন সব কেড়ে নেওয়ার পর পলিথিনের ছাউনি দিয়ে আবার ঘর তুলি। দিনের পর দিন রাস্তায় ফেলে দেওয়া সবজি কুড়িয়ে এনে এক বেলা খেয়ে থেকেছি।”

অনিরাপত্তার কারণে নিজের তিন মেয়েকেই বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন জানিয়ে নীলুফার বলেন, “বস্তিতে তরুণীদের থাকা নিরাপদ নয়, বখাটেরা উত্ত্যক্ত করে, অপহরণের হুমকি দেয়।”

ক্যান্সারে আক্রান্ত ছেলে আর গত মাসে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়া স্বামীর পর ৫১ বছর বয়সেও নীলুফরের সংগ্রাম থামেনি। তিনি বলেন, “এই বয়সেও আমি রাস্তায় ঘুরে কাপড় বিক্রি করি, যেন একমুঠো চাল জোগাড় করতে পারি। একদিন ঘরে বসে থাকলে কারও মুখে খাবার জোটে না।”

সংকট ও সমাধানের উদ্যোগ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এই বিপুল সংখ্যক জলবায়ু অভিবাসীর চাপ সামলাতে এবং তাদের স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি)-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, “শহরগুলোকে অভিবাসী-বান্ধব হতে হবে। শুধু আবাসন নয়, তাদের জন্য পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”

এই লক্ষ্যেই মংলা, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা ও বোরহানউদ্দিনের মতো কয়েকটি পৌরসভায় ‘জলবায়ু-সহনশীল অভিবাসী-বান্ধব শহর’ নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন কেন্দ্রের (গবেষণা কর্মকর্তা মুনিয়া তাহসিন জানান, এই প্রকল্পের আওতায় বন্যা-প্রতিরোধী আবাসন ও উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে।

ব্র্যাকের নগর উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্প সমন্বয়কারী শাহরিয়ার মোহাম্মদ ফরহাদ জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩,০০০ নিম্ন আয়ের মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

তবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কর্মী হরজিৎ সিং বলেন, “উন্নত দেশগুলো জলবায়ু অভিবাসীদের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসছে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট মোকাবিলার জন্য সঠিক নীতি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।”

পাঠকপ্রিয়