রপ্তানি আয় বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য আনার সরকারি উদ্যোগ বাস্তবে তেমন সফল হয়নি। গত দুই দশকে হিমায়িত খাদ্য, পাট ও চামড়ার মতো সম্ভাবনাময় খাতের অবদান কমার বিপরীতে রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখন একাই এ খাতের দখলে।
তবে এই একক খাতের ওপর নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরির পাশাপাশি একে একটি ‘ভূ-অর্থনৈতিক অস্ত্রে’ পরিণত করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় ক্রেতারা এই নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়ে দরকষাকষির সময় প্রায়ই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।
নির্ভরতার ঝুঁকি ও ভূ-রাজনীতি
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮১.৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (৪৪%) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১৮%)। এই বাজারনির্ভরতার কারণে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর থেকে শ্রমিকের অধিকার ও কারখানার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো সামনে এনে পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশকে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে আসছে। সম্প্রতি ট্যারিফ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির সময় বাংলাদেশের এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে বাণিজ্য সুবিধার বিপরীতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যখন শুল্ক সুবিধা হারাবে, তখন এই ভূ-অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বলেন, “আমাদের রপ্তানিতে দ্বিমুখী ঝুঁকি রয়েছে: একটি হলো শিল্পকেন্দ্রিক এবং অন্যটি হলো দেশকেন্দ্রিক। কোনো একটি পরাশক্তির ওপর এতটা নির্ভরশীল হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা, তাদের বাজারকে সবসময় একটি পলিসি টুল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটি এক ধরনের ভুল নীতি ছিল, যা থেকে আমাদের দ্রুত সরে আসতে হবে।”
অন্যান্য খাতের পিছিয়ে পড়া
একসময় দেশের রপ্তানির প্রায় পুরোটাই আসত পাট থেকে। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল হিমায়িত খাদ্য। কিন্তু গত দুই দশকে দুটি খাতেরই রপ্তানি হিস্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০-২০০৫ সময়কালে মোট রপ্তানিতে হিমায়িত খাদ্যের অবদান ছিল ৫.২ শতাংশ, যা ২০১৮-২০২৩ সময়ে মাত্র ১.১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে চামড়া খাতের অবদান ৩.৬ শতাংশ থেকে কমে ১.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে, তৈরি পোশাকের হিস্যা ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তা এখনো ২ শতাংশের ঘরেই সীমাবদ্ধ।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এলএফএমইএবি) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, “পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে না পারা আমাদের নিজেদেরই ব্যর্থতা। অন্যান্য খাতে সরকারের মনোযোগ ছিল না, তাই ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে যাননি।”
শিল্প মালিকদের বক্তব্য
শিল্প মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে খাতটি কঠিন সময় পার করছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আইএলও আমাদের বাণিজ্য সুবিধাকে পুঁজি করে ট্রেড ইউনিয়নের মতো যেসব শর্ত দিচ্ছে, তা শিল্পের বিকাশের জন্য সহায়ক নয়।”
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, এই পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, “অন্যান্য খাতগুলো দাঁড়াতে পারেনি। তবে এটা ঠিক যে, আমাদের রপ্তানি ঝুড়ি আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ হলে আমরা ভিয়েতনামের মতো শক্তভাবে দরকষাকষি করতে পারতাম। ভবিষ্যতে ঝুঁকি এড়াতে আমাদের অবশ্যই পণ্যের বৈচিত্র্যায়নে যেতে হবে।”
উত্তরণের পথ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত একটি টাস্কফোর্স রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দিয়েছে। টাস্কফোর্সের সুপারিশে তৈরি পোশাক খাতে আরও মূল্য সংযোজন, পোশাকবহির্ভূত অন্যান্য শ্রমঘন খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দক্ষতাভিত্তিক জটিল পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।